মাদারীপুর প্রতিনিধি:
মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলার পালরদী নদীর অব্যাহত ভাঙনে বিলীন হয়ে যাচ্ছে কালকিনি-ফাঁসিয়াতলা পাকা সড়কের আলীনগর এলাকার প্রায় আধা কিলোমিটার অংশ। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) সমন্বয়হীনতা ও কাজে ধীরগতির কারণে সড়কটির এই বেহাল দশা সৃষ্টি হয়েছে। এতে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে যান চলাচল বন্ধ থাকায় চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন স্থানীয় অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সড়কটির ভাঙন এতটাই ভয়াবহ রূপ নিয়েছে যে, যেকোনো সময় নদীর গর্ভে তা পুরোপুরি বিলীন হয়ে যেতে পারে। এমনটি হলে আশপাশের গ্রামগুলোর যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। বর্তমানে অত্যন্ত ঝুঁকি নিয়ে পায়ে হেঁটে এই ভাঙা সড়ক দিয়েই যাতায়াত করছেন আলীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয়, কালীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চ বিদ্যালয় এবং তিনটি মাদ্রাসার শত শত শিক্ষার্থী।
সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় ঐতিহ্যবাহী ফাঁসিয়াতলা হাটের ব্যবসায়ীরাও চরম বিপাকে পড়েছেন। হাজার হাজার মানুষ ও ব্যবসায়ীরা তাঁদের পাট, সরিষা, মসুর ডাল, খেসারি, গরু-ছাগল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের গাড়ি নিয়ে হাটে যাতায়াত করতে পারছেন না।
ফাঁসিয়াতলা হাট কমিটির সভাপতি মামুন সরদার বলেন, “সড়কটি ব্যবহার করতে না পারায় ব্যবসায়ীদের বাধ্য হয়ে বিকল্প এবং দূরের পথ দিয়ে হাটে আসতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। বাড়তি দামের কারণে হাটে এখন ব্যবসায়ী ও ক্রেতার সংখ্যা দিন দিন কমতে শুরু করেছে।”
ভাঙনের মাত্রা বাড়ার পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী বালু ব্যবসায়ীদের দুষছেন এলাকাবাসী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জানান, অবৈধভাবে ড্রেজার বসিয়ে নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলনের কারণেই সড়কটি দ্রুত ধসে পড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আলম সরদার আক্ষেপ করে বলেন, “সব জায়গায় উন্নয়ন হয়, শুধু আমাদের এখানেই নেই। আমরা কী দোষ করলাম যে আমাদের রাস্তাটি সংস্কার বা নতুন করে নির্মাণ করা হচ্ছে না?”
কালীনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. সোহরাব হোসাইন কিরন বলেন, “নদীর ওই স্থানটিতে রিটেইনিং ওয়াল (প্রতিরক্ষামূলক দেয়াল) নির্মাণ করে ভাঙন রোধ করা গেলে রাস্তাটি টিকবে। এতে শিক্ষার্থীরা অন্তত নিরাপদে স্কুলে যাতায়াত করতে পারবে।”
আলীনগর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্রশাসনিক কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান জানান, “পরিষদের নিজস্ব অর্থায়নে আমরা বাঁশ দিয়ে রাস্তাটি সাময়িকভাবে মেরামতের চেষ্টা করেছি। তবে এখানে দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”
এ বিষয়ে দুই সরকারি দপ্তরের মধ্যে রশি টানাটানি ও দায় এড়ানোর চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। কালকিনি উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী রেজাউল করিম বলেন, “নদীর ভাঙনে যখন কোনো রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তখন নদীশাসনের ব্যবস্থা পানি উন্নয়ন বোর্ডই নিয়ে থাকে। তবে বিষয়টি আমি মাদারীপুর জেলার নির্বাহী প্রকৌশলী স্যারকে জানিয়েছি। তিনি জেলা সমন্বয় কমিটির সভায় এটি উত্থাপন করবেন।”
অন্যদিকে মাদারীপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সানাউল কাদের খান বলেন, “যেহেতু এটি এলজিইডির রাস্তা, তাই রাস্তাটি রক্ষার জন্য তাদেরই নিজস্ব বরাদ্দ থাকতে পারে। পাউবো যদি এলজিইডির রাস্তা বাঁচানোর জন্য কাজ করতে চায়, তবে আলাদাভাবে প্রকল্প নিতে হবে, যা বেশ সময়সাপেক্ষ ব্যাপার।”
সার্বিক বিষয়ে মাদারীপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী বাদল চন্দ্র কীর্ত্তনীয়া বলেন, “পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমরা স্থানীয় সংসদ সদস্য মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করে কাজে গতি ফিরিয়ে আনা এবং অতি দ্রুত এই সংকট সমাধানের চেষ্টা করব।”
