জিনাত তাবাচ্ছুম
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একমাস পেরিয়ে গেলেও এখনো নির্বাচনকে ঘিরে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ চলছে। বিশেষ করে ধর্মভিত্তিক বা ইসলামিক রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে সমাজে অনেক প্রশ্ন উঠেছে। অনেক কর্মী-সমর্থক মনে করেছিলেন, এবার হয়তো ইসলামী দলগুলো বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করবে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, তারা কিছু আসন পেলেও ক্ষমতার কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি। যদিও বিগত নির্বাচনের তুলনায় অনেক ভালো করেছে।
এই ফলাফলকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ধরনের বিশ্লেষণ সামনে এসেছে। কেউ বলছেন সাংগঠনিক দুর্বলতা, কেউ বলছেন রাজনৈতিক কৌশলের ঘাটতি। আবার কিছু সেকুলার মানসিকতার মানুষ এটিকে ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে বলছেন, ইসলাম হেরে গেছে অথবা বাংলাদেশ একটি বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। কিন্তু এই ধরনের ব্যাখ্যা প্রকৃতপক্ষে ভুল এবং বিভ্রান্তিকর। কারণ ইসলাম কোনো নির্বাচনে জয়ী বা পরাজিত হওয়ার বিষয় নয়। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা; এটি কোনো রাজনৈতিক দলের নাম নয়। তাই একটি নির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে ইসলাম হেরে গেছে এমন দাবি করার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই।
বরং প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত, যারা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কথা বলেন এবং এত পরিশ্রম করে সেই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করেছেন, তারা কি ইসলাম প্রতিষ্ঠার সঠিক পথ অনুসরণ করছেন? না করেন নাই। তারা সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে সরে গিয়ে আল্লাহর রসুলের মতো জেহাদ ও কেতালের মাধ্যমে দীন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা ছেড়ে অন্য পন্থা অবলম্বন করেছেন। তারা পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতার দেখানো পথ অনুসরণ করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। এই পন্থায় সাফল্য আশার কথা নয়, যেহেতু এই পন্থা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের দেখানো পন্থা নয় সেহেতু এই পন্থায় আল্লাহর সাহায্যও আশার কথা নয়।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা

মুসলমানরা প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে সূরা ফাতিহা পাঠ করে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, “ইহদিনাস সিরাতাল মুস্তাকিম”। এর অর্থ, হে আল্লাহ, আমাদেরকে সরল পথে পরিচালিত করুন। সিরাতুল মুস্তাকিম হলো আল্লাহর দেখানো সঠিক পথ। এর বিপরীতে রয়েছে দালালাহ বা ভ্রান্ত পথ, যা মানুষের তৈরি বা ইবলিশের প্ররোচনায় গড়ে ওঠে।
সিরাতুল মুস্তাকিমের মূল ভিত্তি হলো তওহীদ। তওহীদ মানে কেবল মুখে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” উচ্চারণ করা নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহকে একমাত্র বিধানদাতা হিসেবে মেনে নেওয়া। অর্থাৎ ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি এবং রাষ্ট্র সব ক্ষেত্রেই আল্লাহর সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করা। যেখানে মানুষ আল্লাহর বিধানের বিপরীতে নিজের সিদ্ধান্ত নেয়, সেখানেই শুরু হয় সরল পথ থেকে বিচ্যুতি।
উদাহরণ হিসেবে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রের কথা ধরা যেতে পারে। কোরআনে আল্লাহ সুদকে স্পষ্টভাবে হারাম ঘোষণা করেছেন। আধুনিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অনেকেই যুক্তি দেন যে সুদ ছাড়া অর্থনীতি চলতে পারে না। ব্যাংকিং বা বিনিয়োগ ব্যবস্থায় সুদ প্রয়োজন। কিন্তু যারা সুদের বিরুদ্ধে আল্লাহর বিধান অগ্রাহ্য করে, তারা সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত হচ্ছে। এর ফলও ভালো হচ্ছে না। সুদভিত্তিক অর্থনীতির কারণে দুনিয়া জোড়া অর্থনৈতিক বৈষম্যই তার প্রমাণ। এই সিস্টেম অল্পকিছু মানুষকে সীমাহিন ধনী করেছে আর এদিকে শতকোটি মানুষকে দরিদ্র করেছে।
পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে কোরআন নির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়েছে। কেউ যদি সেটিকে আধুনিক যুগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না বলে একটু অতি আপডেট হয়ে নিজের তৈরি নতুন নিয়মকে প্রাধান্য দেয়, তাও সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুতি।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে মানুষের মধ্যে তওহীদের ভিত্তিতে একটি ঐক্যবদ্ধ সমাজ গড়ে তুলেছিলেন। এরপর শুরু হয় সংগ্রাম। সাহাবায়ে কেরাম অকল্পনীয় ত্যাগ ও সংগ্রামের মাধ্যমে অর্ধেক পৃথিবীতে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাদের সংগ্রামের মূল ভিত্তি ছিল একটি ঘোষণা, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ। অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম ছাড়া আর কারও হুকুম মানা যাবে না।
রাষ্ট্রীয় জীবনে দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও একই বিষয় প্রযোজ্য। অনেক ইসলামিক দল দীর্ঘদিন ধরে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কথা বলে আসছে। কিন্তু তারা গণতান্ত্রিক নির্বাচনী প্রক্রিয়াকেই দ্বীন প্রতিষ্ঠার প্রধান মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে। অথচ আল্লাহর দেখানো পথ অর্থাৎ তারা জেহাদ ও কেতালের পথ ত্যাগ করে মানবসৃষ্ট ভোট ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছে।
এখানেই নিহিত, ইসলামী দলগুলোর পরাজিত হবার কারণ। অনেকে দাবি করতে পারেন ভোটে কারচুপি হয়েছে বা ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত কারণ হলো, ইসলামি দলগুলো জয়ী হতে পারেনি কারণ তারা আল্লাহর প্রদত্ত পথ, সিরাতুল মুস্তাকিম অনুসরণ করেননি। দীন প্রতিষ্ঠার জন্য আল্লাহর দেখানো পথ হলো জেহাদ এবং কেতাল অথচ তারা এই সহজ সরল পথ বাদ দিয়ে বেছে নিয়েছেন পশ্চিমা বস্তুবাদী সভ্যতার শেখানো গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়া।
অর্থাৎ আল্লাহর দীন বিজয়ী হবে, তবে এটি সম্ভব সিরাতুল মুস্তাকিম অনুসরণ করে অর্থাৎ আল্লাহ প্রদত্ত সঠিক পথ অনুসরণ করে। জেহাদ ও কেতালকে বাদ দিয়ে নির্বাচনকে দীন প্রতিষ্ঠার প্রধান হাতিয়ার হিসেবে নেওয়াই ইসলামী দলগুলোর ভুল ও দুর্বলতা।
যে জাতি সিরাতুল মুস্তাকিমে অটল থাকবে এবং আল্লাহর হুকুম অনুযায়ী কাজ করবে, তার জন্য সফলতার পথ উন্মুক্ত। যখন কোনো দল আল্লাহর নির্ধারিত পথ থেকে সরে গিয়ে অন্য পথে চলতে শুরু করে, তখন সেই পথে আল্লাহর সাহায্য আসবে না। আর আল্লাহর সাহায্য ছাড়া দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
আল্লাহ আমাদের ইসলামি দলগুলোকে সিরাতুল মুস্তাকিমে অটল থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
[লেখক: কলামিস্ট]

















