ইরানে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় বিশ্বজুড়ে বিস্ময়, ক্ষোভ ও প্রতিবাদের ঢেউ দেখা গেলেও বাস্তবতা হলো- এ ধরনের প্রতিক্রিয়া মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পুরোপুরিভাবে ব্যর্থ। ‘নিন্দা’, ‘মানববন্ধন’ কিংবা ‘বিবৃতি’ শক্তিধর রাষ্ট্রের নীতি বদলায় না বরং এসব প্রতীকী কার্যক্রম নির্দিষ্ট অবস্থানেই সীমাবদ্ধ থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত এই হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি দীর্ঘদিন ধরে চলমান একটি ভূরাজনৈতিক কৌশলের ধারাবাহিক অংশ। চোখের সামনে যেখানে ফিলিস্তিনে দখলদারিত্ব, কাশ্মীরে দমন-পীড়ন, মিয়ানমারে জাতিগত নিধন চলছে; লিবিয়া, লেবানন ও আফগানিস্তানে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের নগ্ন সামরিক হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটছে- সেখানে ‘কে নিন্দা করল’ বা ‘কে প্রতিবাদ করল’ এটি কোনো জরুরী বিষয় নয়। এক্ষেত্রে আসল প্রশ্ন হচ্ছে, এই রুক্ষ বাস্তবতায় কার্যকর ও টেকসই সমাধানের পথ কোনটি?
ইরানের ঘটনার প্রতিবাদে আমাদের দেশের ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অনেককেই যে মিটিং-মিছিল, পথসভা, র্যালী ও প্রতিরোধ কর্মসূচি করতে দেখা যাচ্ছে তা একদিকে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া হলেও প্রকৃতভাবে প্রচলিত ধারার রাজনৈতিক একটি কৌশল। আমাদের দেশের বহু ধর্মীয় সংগঠন ও রাজনৈতিক দল বহু আগে থেকেই ইস্যুভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাই তাদের কাছে এসব আন্তর্জাতিক ঘটনা প্রায়ই রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে কাজ করে। মূলত কর্মী ও সমর্থকদের সক্রিয় রাখার জন্য এ সকল ইস্যুভিত্তিক আন্দোলনকে তারা পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করে। ফলে তাদের পক্ষ থেকে দেশজুড়ে এ সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচী দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু আদৌতে মূল সংকট নিরসনে এ সকল ‘স্টান্টবাজি’ কোনো উপকারে আসে না।
ইসরায়েল ও পশ্চিমা বিশ্বের নীতিনির্ধারকদের কাছে মুসলিম বিশ্বের গতিপ্রকৃতি খুব চেনা। কোনো নির্দিষ্ট স্থানে হামলা হলে গণবিক্ষোভ, উত্তপ্ত স্লোগান কিংবা প্রতীকী প্রতিবাদের যে জোয়ার তৈরি হয়, তার চূড়ান্ত পরিণতি তাদের কাছে ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। তারা খুব ভালো করেই জানে যে, সাময়িক এই উত্তেজনা অচিরেই ম্লান হয়ে যাবে। আর এ কারণেই তারা পরবর্তী আগ্রসনের ক্ষেত্রে পিছপা হয় না। অথচ আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এ ক্ষেত্রে বরাবরই কৌশলী ও নিস্পৃহ ভূমিকা পালন করেন। তাদের কূটনৈতিক বক্তব্যের আড়ালে মূল সংকটের সমাধানটি সবসময়ই ধামাচাপা পড়ে থাকে। ফলস্বরূপ, মুসলিম উম্মাহর প্রতিক্রিয়া কেবল আবেগ আর মিছিলের গণ্ডিতেই ঘুরতে থাকে, কার্যকর কোনো পদক্ষেপ বা স্থায়ী সমাধানের দিকে তা এগোতে পারে না।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

মুসলিম উম্মাহকে যদি একটি অখণ্ড জাতিসত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবে সে জাতির একটি সঠিক আদর্শ ও ভিত্তি থাকতে হবে। আর সে মূল ভিত্তি হচ্ছে তওহীদ- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ”- এক আল্লাহর হুকুম ছাড়া আমরা আর কারো হুকুম মানি না- অর্থাৎ, সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক একমাত্র আল্লাহ। পুরো মুসলিম বিশ্বকে এ মৌলিক ঐক্যের জায়গায় অবস্থান করার কথা থাকলেও বাস্তবে সেটা হয়নি। আমরা আজ শতাধিকভাগে বিভক্ত। শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্ব কিংবা মাযহাবী বিতর্কের অন্তহীন গোলকধাঁধায় আমরা আজ আমাদের সর্বস্ব হারাতে বসেছি। আমাদের বোধশক্তি এতটাই লোপ পেয়েছে যে, এই আত্মঘাতী অনৈক্য একটি জাতির জন্য কতটা দুর্ভাগ্যজনক, সেটাও আমারা বুঝতে পারছি না। আর যখন আমরা অভ্যন্তরীণ কলহ আর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে লিপ্ত রয়েছি তখন অন্যান্য জাতি তাদের ইচ্ছেমত আমাদের সাথে সব ধরনের অন্যায় করে যাচ্ছে এবং আমাদের সমূলে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো জানে যে, আমরা একক কোনো শক্তি নই, বরং বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল কতগুলো গোষ্ঠী মাত্র, তাই আমাদেরকে এক এক করে ধ্বংস করা খুবই সহজ কাজ। অথচ একটি ছোট্ট ভূখণ্ড আক্রমণ হওয়ার সাথে সাথেই মুসলমানদের উচিত ছিল সকল ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে এক ও অভিন্ন জাতিসত্ত্বায় রূপান্তরিত হওয়া। কিন্তু আফসোসের সাথে বলতে হয় সংখ্যায় এত বিশাল মুসলিম জাতির জনগণ ও নেতৃবৃন্দ আজ এ সহজ সত্যকে উপলব্ধি করতে পারছেনা। তবে আমাদের উপলব্ধিতে না আসলেও বহির্বিশ্বের কাছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ আজও একটি একক সত্তা হিসেবেই বিবেচিত। সেখানে সুন্নি-শিয়া, হানাফি-হাম্বালি, জামায়াত-চরমোনাই, আহলে কোর’আন-আহলে হাদিস ইত্যাদি আলাদা আলাদা কোনো পরিচয় নেই। তাদের কাছে আমাদের একটাই পরিচয় আমরা মুসলমান আর তারা তাদের স্বার্থোদ্ধারের জন্য আমাদের সকলকেই তাদের ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত করছে।
অথচ মুসলমানরা যদি সত্যিকারভাবেই ঐক্যবদ্ধ থাকত, তবে ইসরায়েল বা অন্য কোনো পশ্চিমা শক্তির পক্ষে এত সহজে আগ্রাসন চালানো সম্ভব হতো না। অথচ আমরা দেখতে পাই একটি মুসলিম দেশকে ধ্বংস করার জন্য তারা আরেকটি মুসলিম দেশের সহায়তা নিচ্ছে। এক মুসলিম দেশ তার পার্শ্ববর্তি আরেকটি মুসলিম দেশকে সহায়তা না করে সে দেশকে ধ্বংস করার জন্য পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের নিজের দেশে ঘাঁটি গড়ার অনুমোদন দিয়ে রেখেছে। এ ধরনের আত্মঘাতি ঘটনা ইতোপূর্বে কোনো জাতি করেছে কিনা তা ইতিহাসেও নজিরবিহীন।
তাহলে এখন এ সংকটপূর্ণ অবস্থান থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? যদি সত্যিকার অর্থেই সমাধান করতে হয় তবে সর্বপ্রথম পুরো মুসলিম জাতিকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির উপর ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আর সে শক্তিশালী ভিত্তি হচ্ছে তওহীদ- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’- অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম বিধান মানি না। ভুললে চলবে না, আমাদের আল্লাহ এক, আমাদের রসুল এক, আমাদের কোর’আন এক- অতএব মুসলিম জাতিও হবে এক ও অভিন্ন। এ আদর্শিক ভিত্তি এখন মুসলমানদের গ্রহণ করতে হবে। মুসলিম উম্মাহর প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত কোর’আনে আল্লাহ প্রদত্ত জীবন বিধান অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করা। আজ ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্র যে ভৌগলিক জাতিরাষ্ট্রের পরিচয়ে বিভক্ত, সে বিভক্তিকে দূরে করে আমাদের এক মুসলিম জাতিসত্ত্বার কথা চিন্তা করে এক ও অভিন্ন জাতিতে পরিণত হতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রকৃত মো’মেন হিসেবে ঈমানের সঠিক চেতনা ও আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম অর্থাৎ জেহাদের প্রকৃত রূপকে এ জাতির সামনে তুলে ধরতে হবে। আজ যেখানে ‘জেহাদ’ শব্দটিকে অপব্যাখ্যা দিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সাথে মিশিয়ে দেয়া হয় সে ভুল ব্যাখ্যাকে দূর করতে হবে। মুসলিম উম্মাহর সামনে জেহাদের প্রকৃত রূপ তুলে ধরতে হবে যাতে তারা বুঝতে পারে যে জেহাদ হচ্ছে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার জন্য নিজেদের জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহ রাস্তায় সর্বাত্মক সংগ্রাম করা যার মাধ্যমে সমগ্র পৃথিবীতে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে।
তৃতীয়ত, আমাদের এ জেহাদ করার জন্য সঠিক কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। আল্লাহ তাঁর রসুলকে যে কর্মসূচী দিয়েছিলেন এ শেষ দীনকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমাদেরও সে একই কর্মসূচী গ্রহণ করতে হবে। কর্মসূচীর বিষয়ে রসুল (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ আমাকে পাঁচটি কাজের আদেশ দিয়েছেন, আমি তোমাদেরকে সেই পাঁচটি কাজের আদেশ করছি। ইসলামকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠা করতে আল্লাহ যে নীতি রসুলকে দিয়েছেন সেই নীতির উপর ভিত্তি করা একটি পাঁচ দফা কর্মসূচি আল্লাহ তাঁর রসুলকে দান করলেন। এ পাঁচ দফা কর্মসূচি তিনি তাঁর উম্মাহর উপর অর্পণ করার সময় বলছেনÑ এ কর্মসূচি আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন, (আমি সারাজীবন এ কর্মসূচি অনুযায়ী সংগ্রাম করেছি) এখন এটা তোমাদের হাতে অর্পণ করে আমি চলে যাচ্ছি। সেগুলো হল: ঐক্যবদ্ধ হও, (নেতার আদেশ) শোন, (নেতার ঐ আদেশ) পালন কর, হিজরত কর এবং (এ দীনুল হক কে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠার জন্য) আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম, জেহাদ কর।
যে ব্যক্তি (কর্মসূচির) এ ঐক্যবন্ধনী থেকে এক বিঘত পরিমাণও বহির্গত হল, সে নিশ্চয়ই তার গলা থেকে ইসলামের রজ্জু (বন্ধন) খুলে ফেলল- যদি না সে আবার ফিরে আসে (তওবা করে) এবং যে ব্যক্তি অজ্ঞানতার যুগের (কোনও কিছুর) দিকে আহ্বান করল, সে নিজেকে মুসলিম বলে বিশ্বাস করলেও, নামায পড়লেও এবং রোযা রাখলেও নিশ্চয়ই সে জাহান্নামের জ্বালানী পাথর হবে [আল হারিস আল আশয়ারি (রা.) থেকে আহমদ, তিরমিযি, বাব উল এমারাত, মেশকাত]।”
সবশেষে এ কর্মসূচী পালনের জন্য যোগ্য নেতা ও তাঁর নেতৃত্ব প্রয়োজন। তাই মুসলিম উম্মাহকে একক নেতৃত্ব নিয়ে ভাবতে হবে। জনগণ যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করে এবং মুসলিম বিশ্বের নেতৃবৃন্দ যদি জাতিকে উত্তোরণের জন্য নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থকে ত্যাগ করতে না পারেন তাবে যতই উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক না কেন, এ জাতি বর্তমান সংকট থেকে বের হতে পারবে না। কাজেই এখন জনগণকে সিদ্ধান্তে আসতে হবে যে, তারা সত্যিকার অর্থেই পরিত্রাণের পথে এগোবে কিনা। যদি মুক্তির পথে হাঁটতে চায় তবে তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহ প্রদত্ত দীনকে গ্রহণ করে এক নববিপ্লব সংঘটিত করা এখন সময়ের দাবী। সকল মুসলিম মন থেকে ইসলামের সঠিক আদর্শকে গ্রহণের মাধ্যমে এক নবজাগরণের সৃষ্টি করবে এবং সকল অপশক্তির বিরুদ্ধে এক নেতার নেতৃত্বে একযোগে বিপ্লবে ঝাঁপিয়ে পড়বে। ্আর তখনই মুসলমানদের বর্তমান সংকট থেকে পরিত্রাণ সম্ভব।
আমরা, হেযবুত তওহীদ, জনগণের সামনে আজ সে বার্তা নিয়েই দাঁড়িয়ে আছি।



















