মোহাম্মদ আসাদ আলী:
আল্লাহর রসুল যখন আরবে ইসলাম প্রচার শুরু করলেন তখনকার আরব সমাজে চলছিল অজ্ঞানতার যুগ, অন্ধকারের যুগ, আরবিতে যাকে বলা হয় আইয়্যামে জাহেলিয়াত। পৃথিবীর সবচেয়ে পশ্চাৎপদ জনগোষ্ঠী ছিল আরবরা। রোমান ও পারস্যের শাসকরা আরবদেরকে দেখত অবহেলার চোখে। সেই আরবদের মধ্যে যখন ইসলামের আবির্ভাব ঘটল, ইতিহাসের মোড় ঘুরে গেল। অবহেলিত আরবসন্তানরা জেগে উঠল নতুন প্রাণের উল্লাসে! তাদের মাঝে এমন যুগান্তকারী সভ্যতার উন্মেষ ঘটল যার সম্মুখে সমসাময়িক সকল আদর্শ, সকল মতবাদ আবেদন হারিয়ে বর্ণহীন হয়ে গেল। সম্ভাবনাহীন একটি উপাদান বা শূন্য (পি. কে হিট্টির দ্য অ্যারাবস্) থেকে জন্ম হলো বিরাট এক বটবৃক্ষের। সেই বৃক্ষের ছায়াতলে আসলো অর্ধ দুনিয়া। আসুন জেনে নেয়া যাক- প্রকৃত ইসলাম আরবদের মধ্যে কী পরিবর্তন সাধন করেছিল।
ঐক্য প্রতিষ্ঠা: ইসলাম অনৈক্য-হানাহানিতে লিপ্ত দাঙ্গাবাজ আরবদেরকে ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ করেছিল। বংশানুক্রমিক শত্রুতা আর রক্তপাতে নিমজ্জিত আরব জাতিকে একে অপরের ভাই বানিয়ে দিয়েছিল।
শৃঙ্খলা আনয়ন: বিশৃঙ্খল ও উচ্ছৃঙ্খল আরবদেরকে শৃঙ্খলা শিক্ষা দিয়েছিল ইসলাম। যাদের জীবনযাপনে এতদিন শৃঙ্খলার কোনো লেশমাত্রও ছিল না, তারা ইসলামের আদর্শ গ্রহণের পর পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল। তাদের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, পোশাক-আশাক, খাদ্যগ্রহণ, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, সামাজিকতা, জাতীয় ও সামরিক কর্মকাণ্ডের পুরোটাই ছিল সুশৃঙ্খল ও সুপরিকল্পিত।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা: আরবদের ব্যাপারে একটা কথা প্রচলিত ছিল যে, তারা নিজ গোত্রের বাইরে কস্মিনকালেও অন্য কারো নেতৃত্ব মানতে পারে না ও আনুগত্য করতে পারে না। মূলত আরবদের এই চরিত্রের দরুন অনেকে চেষ্টা করেও আরবের রাজা-বাদশাহ হতে পারেনি। কিন্তু ইসলাম আরবদের এই চারিত্রিক দুর্বলতা ঘুঁচিয়ে এতটাই আনুগত্যশীল করে তোলে যে, ওই আরবরাই বিশ্বনবীর প্রত্যেকটি হুকুম অক্ষরে অক্ষরে পালন করতেন এবং তা করতে গিয়ে জীবন দিতেও দ্বিধা করতেন না। শুধু রসুলাল্লাহর হুকুমই নয়, যিনিই আমিরের দায়িত্বে থাকতেন, তার আদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে “আসমাউ ওয়া আত্তাবিয়্যু” অর্থাৎ “শুনলাম এবং পালন করবই” বলে ঝাঁপিয়ে পড়তেন আদেশ বাস্তবায়নের কাজে।
ন্যায়-অন্যায়ের মানদণ্ড পরিবর্তন: ইসলাম আরবদের গোত্রপ্রীতি ও সাম্প্রদায়িক মনোভাব দূরে করে ফেলেছিল। শেষ নবীর আগমনের আগে আরবরা মূলত গোত্রের জন্য লড়াই করত, গোত্রের জন্য জীবন দিত, গোত্রের জন্যই শত্রুতা ও মিত্রতা করত। এখানে ন্যায়-অন্যায়ের কোনো ব্যাপার ছিল না। নিজের গোত্রের লোক অন্যায় করলে, অন্যরাও সেই অন্যায়ের পক্ষেই দাঁড়িয়ে যেত। ইসলামের আদর্শ প্রতিষ্ঠা হবার পর সমাজ থেকে গোত্রভিত্তিক সাম্প্রদায়িকতা মুছে গেল। সবাই মিলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গেল। তারা লড়াই করতে লাগল ন্যায়ের জন্য, সত্যের জন্য, মানবতার কল্যাণের জন্য। অন্যায়কারী বাবা, মা ও ভাইয়ের বিরুদ্ধেও অস্ত্রধারণ করতে দ্বিধা করেননি সাহাবায়ে কেরামগণ।
মর্যাদার মানদণ্ড পরিবর্তন: আরব-অনারব, আশরাফ-আতরাফ, ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-নিরক্ষরের আকাশ-পাতাল মর্যাদার ব্যবধান দূর করেছিল ইসলাম। মর্যাদার একমাত্র মানদণ্ড নির্ধারিত হয় তাকওয়া অর্থাৎ ন্যায়ের পক্ষে থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা। যিনি যত ন্যায়ের পক্ষাবলম্বনকারী, তিনি ছিলেন তত মর্যাদাবান।
মানবতার জয়গান: যে সমাজে দাসদেরকে মানুষ মনে করা হত না, সেই সমাজের ক্রীতদাস বেলালকে (রা.) (মক্কা বিজয়ের দিনে) ক্বাবার ঊর্ধ্বে উঠিয়ে আজান দিতে বলেছিলেন আল্লাহর রসুল। আল্লাহর রসুল বুঝিয়ে দিলেন- সবার ঊর্ধ্বে মানুষ, সবার উপরে মানবতার স্থান। আল্লাহর কাছে একজন সত্যনিষ্ঠ মানুষের মূল্য তাঁর ক্বাবার চেয়েও অধিক। একইভাবে ক্রীতদাস যায়েদ ও তার পুত্র উসামাকে সেনাপ্রধান বানিয়ে রসুল (সা.) প্রমাণ করলেন- যোগ্যতা ও তাকওয়ায় যে শ্রেষ্ঠ সেই প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী। বংশ-আভিজাত্যের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব নয়। এই সাম্যবাদী আদর্শ লাখ লাখ বেলাল, যায়েদদের অন্তরে মুক্তির তুফান সৃষ্টি করেছিল তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
বাকস্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা: নির্যাতিত-নিপীড়িত, শোষিত মানুষ, যারা বেঁচে থাকত গোত্রপতি, সমাজপতি ও যাজক-পুরোহিতদের কৃপাগুণে, যাদের কোনো অধিকার ছিল না, সম্মান ছিল না, যাদের মাথাকাটা যাবার জন্য সমাজপতিদের একটি সিদ্ধান্তই যথেষ্ট ছিল, ইসলাম তাদের অধিকার ফিরিয়ে দিয়েছিল। এমন সমাজব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল যে, ওই দাসশ্রেণির মানুষই এক সময় তাদের ‘আমিরুল মু’মিনিনের’ গায়ের জামা কীভাবে বানানো হলো তার কৈফিয়ত জানতে চেয়েছে, জনসম্মুখে কৈফিয়ত দিতে হয়েছে অর্ধ-পৃথিবীর শাসককে। শুধু ওই সময়ের পৃথিবীতেই নয়, এমন দৃষ্টান্ত আজকের যুগেও কেউ স্থাপন করতে পারে না।
আর্থিক নিরাপত্তা: অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী ছিল আরব। ছিল না খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসার নিশ্চয়তা। খাবারের কষ্টে ধুকে ধুকে মরত হাজারও মানুষ। দেখার কেউ ছিল না, তাদের কষ্ট উপলব্ধির কেউ ছিল না। আল্লাহর রসুল এলেন তাদের মুক্তিদূত হয়ে। ইসলামের আদর্শ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে হতদরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটা আরম্ভ হলো। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই আরবের মৌলিক সঙ্কটগুলো একে একে বিদায় নেওয়া শুরু করল। ইসলাম ক্ষুধার্তকে খাদ্য দিয়েছে, বাস্তুহারাকে বাস্তু দিয়েছে। কে কোথায় কী সমস্যায় পড়ে আছে তার সমাধান করার জন্য রাতের আঁধারে রাস্তাঘাটে, অলি-গলিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন ইসলামের খলিফা, অর্ধপৃথিবীর শাসনকর্তা। যারা কিছুদিন আগেও অর্ধাহারে অনাহারে দিন কাটানোকেই নিয়তি বলে ধরে নিয়েছিল, ইসলাম তাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে দিল। ইসলাম প্রতিষ্ঠার পর তাদের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এই পর্যন্ত পৌঁছায় যে, ধনী ব্যক্তিরা যাকাতের সম্পদ উটের পিঠে বোঝাই করে রাস্তায় ঘুরে বেড়াত, যাকাত গ্রহণ করার মতো হতদরিদ্র লোক খুঁজে পাওয়া যেত না।
শাসনকার্যে স্বচ্ছতা: ইসলাম জনগণকে জোর-জবরদস্তির শাসন ও শোষণ থেকে উদ্ধার করেছিল। এমন স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল যে, অর্ধপৃথিবীর শাসনকর্তা একটি খেজুরপাতার ছাউনি দেয়া মসজিদে বসে রাজ্য শাসন করতেন। যার আবার একটির বেশি জামা ছিল না। যিনি সর্বদা তটস্থ থাকতেন তার শাসনের অধীনে কেউ কোথাও কষ্ট পাচ্ছে কিনা, একটি কুকুরও না খেয়ে থাকছে কিনা সেই দুশ্চিন্তায়। ঘুম এলে গাছের নিচে ঘুমিয়ে পড়তেন। যার যখন ইচ্ছা খলিফার সাথে দেখা করত, সমস্যা বলত, সমাধান হয়ে যেত।
পরাশক্তির আত্মপ্রকাশ: ইসলামপূর্ব যুগে আরবরা নিজেদেরকে রোমান পারস্যের সেনাদের তুলনায় দুর্বল ও ভীরু মনে করত। কোনোদিন রোমান পারস্যের সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে এই কল্পনাও তাদের মাথায় আসেনি, বিজয় অর্জন তো পরের কথা। সেই আরবদের মধ্যেই ইসলাম এমন অনুপ্রেরণা, শক্তি ও সাহস সঞ্চার করল যে, রোমান পারস্যের অত্যাচারী শাসন থেকে মানুষকে উদ্ধারের জন্য তলোয়ার হাতে আরবভূমি থেকে বেরিয়ে পড়ল আরব সন্তানরা। একইসঙ্গে রোমান ও পারস্যশক্তিকে আক্রমণ করে বসল এবং পরাজিত করল। সেই উম্মতে মোহাম্মদী আরবরা পৃথিবীর যেখানেই অন্যায় হতে দেখেছেন, অবিচার হতে দেখেছেন, দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার হতে দেখেছেন, ছুটে গেছেন ন্যায়ের তরবারি হাতে।
নারীর সম্মান প্রতিষ্ঠা: যে সমাজে নারীদেরকে জীবন্ত কবর দেওয়া হতো, নারীদেরকে ভোগ্যবস্তু মনে করা হতো, নারীদের কোনো অধিকার স্বীকার করা হতো না, সেই সমাজেই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হবার পর নারীরা অধিকার ফিরে পেল। সমাজের সর্বাঙ্গনে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলো। এমনকি নারীরা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর মোকাবেলা করে সাহস ও যোগ্যতার প্রমাণ রাখলেন। রসুলাল্লাহর যুগে এমন কোনো জাতীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয় কর্মকাণ্ড ছিল না, যেখানে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি।
মূল কথা হচ্ছে ইসলাম মানুষের বাস্তব সমস্যার বাস্তব সমাধান করতে পেরেছিল। যখন মানুষের সমস্যা ছিল অধিকারহীনতা, অন্যায়, অবিচার, নির্যাতন, স্বাধীনতাহরণ, শোষণ, বঞ্চনা, দারিদ্র; তখন ইসলাম মানুষকে মুক্তির সন্ধান দিতে এগিয়ে এসেছিল। প্রতিষ্ঠা করেছিল ন্যায়, শান্তি, সুবিচার ও নিরাপত্তা। এতে সন্দেহের অবকাশ নেই যে, ওই ন্যায় ও শান্তি দেখেই পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল।
কিন্তু আফসোস! প্রকৃত ইসলামের সেই প্রাঞ্জল আদর্শ আজ নেই। ফলে এককালে যে মুসলিমরা অর্ধদুনিয়াকে ন্যায়, শান্তি ও সুবিচারের অলঙ্কারে সাজিয়ে তুলেছিল সেই মুসলিমরাই আজ সারা পৃথিবীতে সবচেয়ে অবজ্ঞাত, উপেক্ষিত, নির্যাতিত ও অপমানিত জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। যে তওহীদের ভিত্তিতে এই জাতি ইস্পাতের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ থাকত, সেই তওহীদ হারিয়ে বহু শতাব্দী পূর্বেই এই জাতি হাজার হাজার মত-পথ, ফেরকা-মাজহাব-তরিকায় বিভক্ত হয়ে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে গেছে। অথচ তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রকৃত ইসলামকে ধারণ করতে পারলে আবারও উন্নতি-সমৃদ্ধিতে বিশ্বের বিস্ময়ে পরিণত হত।
[লেখক: লেখক ও কলামিস্ট।
যোগাযোগ: ০১৬৭০১৭৪৬৪৩, ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৭১১৭৫১৫৮১।
facebook/asadaliht95; asadali0605@gmail.com]



















