জোবায়ের হাসান:
পৃথিবীতে মানুষের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণী, বিভেদ, বৈষম্য থাকলেও আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষ দুই প্রকার। পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেছেন, মানবজাতি দুটি অংশে বিভক্ত- মো’মেন ও কাফের (সুরা তাগাবুন ২)। বর্তমান বিশ্বে আমরা প্রায় ২০০ কোটির জনগোষ্ঠীর প্রায় প্রত্যেকেই নিজেদেরকে মো’মেন ও মুসলিম বলে বিশ্বাস করি। আমাদের সমাজের বদ্ধমূল ধারণা থেকে আমরা মনে করি কেউ একটু বেশী নামাজি হলে, দান খয়রাত করলে, পোশাকে আরবীয় লেবাস ধারণ করলে সে বুঝি পাক্কা মো’মেন। আবার কেউ ইসলামকে অস্বীকার করলে বা নবীকে নিয়ে কটূক্তি করলে সে কাফের। মূলত কে মো’মেন ও কে কাফের তার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে দিয়ে দিয়েছেন।
আসুন জেনে নেওয়া যাক- আল্লাহর দৃষ্টিতে মো’মেন ও কাফেরের সংজ্ঞা।
মো’মেন কারা?
মো’মেন শব্দটি এসেছে ‘ঈমান’ থেকে। ঈমান শব্দের আক্ষরিক অর্থ ‘বিশ্বাস’। প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী- আল্লাহ, নবী-রসুলগণ, ফেরেশতাকূল, আসমানি কিতাবসমূহ, তকদির, কিয়ামত ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাসকেই বলা হয় ঈমান। আর যারা এসব বিষয়ের প্রতি ঈমান আনেন তারাই হচ্ছেন মো’মেন। কিন্তু আসলেই কি তাই? না। এই সবকিছু বিশ্বাস করেও একজন মানুষ কাফের হতে পারে, যেমন কাফের হয়েছিল আইয়্যামে জাহেলিয়াতের যুগের আরবরা। কীভাবে ব্যাখ্যা করছি। নবী আগমনের পূর্বেও আরবের জনগোষ্ঠী আল্লাহকে বিশ্বাস করত, তাদের নাম রাখত আব্দুল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহর দাস, তারা হজ করত, নবী ইব্রাহিমের নামে পশু কোরবানী করত, কোনো কিছু শুরু করার পূর্বে আমরা যেমন ‘বিসমিল্লাহ’ বলি তেমনি তারা বলত ‘বিসমিকা আল্লাহুম্মা’। অর্থাৎ বিশ্বাসগত দিক থেকে তারা কোনো অংশে কম ছিল না। তবুও তারা মো’মেন নয়। কারণ- মো’মেন হওয়া মানে শুধু বিশ্বাস করে অন্তরে লালন করা নয় বরং কার্যকরভাবে তা প্রতিষ্ঠা করা।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

মূলত মো’মেন হওয়ার স্বীকৃতি ঈমানের ঘোষণার মধ্যেই রয়েছে। ঈমানের প্রথম ঘোষণাই হচ্ছে আল্লাহর তওহীদের ঘোষণা অর্থাৎ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, এর সঙ্গে সমসাময়িক নবী-রসুলের নাম। একে আমরা কলেমা বলি। ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ’ এই কলেমার অর্থ আমাদেরকে বাল্যকাল থেকে শেখানো হয়েছে- ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ বা উপাস্য নেই’। কিন্তু খেয়াল করুন- ‘উপাস্য’ শব্দের আরবি প্রতিশব্দ হচ্ছে ‘মাবুদ’। অর্থাৎ ‘ইলাহ’ ও ‘মাবুদ’ দুটিই আরবি শব্দ। কলেমা বা তওহীদের ঘোষণায় ‘মাবুদ’ শব্দটিই নেই, বরং রয়েছে ‘ইলাহ’। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে- ইলাহ বলতে কী বুঝায়? আরবি ‘ইলাহ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে- হুকুমদাতা, বিধানদাতা, সার্বভৌমত্বের মালিক।
একটু বিস্তারিতভাবে বললে, ‘ইলাহ’ হচ্ছেন সেই সত্ত্বা যার হুকুম মানতে হবে; যার হুকুম অনুসারে ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনৈতিক কাঠামো, আইন-আদালত ইত্যাদি সমস্ত কিছু পরিচালিত হবে। সুতরাং ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর সঠিক অর্থ হচ্ছে- ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা নেই।’ এটাই আল্লাহর তওহীদের ঘোষণা, একত্ববাদের ঘোষণা। স্রষ্টা একজন আছেন এই বিশ্বাস থাকার অর্থ তওহীদ নয়, বরং সেই স্রষ্টার আনুগত্য করার ঘোষণাই হচ্ছে মো’মেন হওয়ার পূর্বশর্ত। একজন মো’মেন ব্যক্তি এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনে একমাত্র বিধান হিসেবে আল্লাহর বিধানকে আলিঙ্গন করে নেন এবং অন্য সমস্ত বিধানকে প্রত্যাখ্যান করেন। তাই মো’মেনের সংজ্ঞা আল্লাহ দিয়েছেন এভাবে-
মো’মেন তো কেবল তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের ওপর ঈমান এনেছে, এতে আর কোনো সন্দেহ পোষণ করেনি এবং জীবন-সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ (সংগ্রাম) করেছে। (সুরা হুজরাত ৪৯:১৫)।
সুতরাং মো’মেন হতে হলে একজন মানুষকে দুটো শর্ত পূরণ করতে হবে:
- তিনি আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে হুকুমদাতা (ইলাহ) হিসেবে মানবেন না।
- আল্লাহর বিধানকে প্রতিষ্ঠার জন্য তার জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ (সর্বাত্মক সংগ্রাম) করবেন।
আজ পুরো মুসলিম বিশ্ব এই সংজ্ঞাতে আছে কিনা একটু খেয়াল করে দেখি। মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থা চলে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র দিয়ে আল্লাহ প্রদত্ত তওহীদভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কোথাও প্রতিষ্ঠিত নেই। মুসলিম বিশ্বের সার্বভৌমত্বের মালিক জনগন, রাজা, শাসক বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী। মুসলিম বিশ্বের অর্থনীতি চলে সুদভিত্তিক, শিক্ষাব্যবস্থা চলে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সিস্টেম দ্বারা, আদালতে বিচার হয় রোমান হাম্বুরাবি ল বা আইন দ্বারা। কোথাও কোনো সংকট সৃষ্টি হলে পশ্চিমাদের তৈরি জাতিসংঘ, ন্যাটো, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংকের কাছে দ্বারস্থ হতে হয়। মুসলিম বিশ্বের নিজেদের মধ্যে কোনো একক নেতৃত্ব নেই, তারা ৫৫টি রাষ্ট্রে বিভক্ত- প্রত্যেকের আলাদা রাষ্ট্রব্যবস্থা, আলাদা পতাকা, আলাদা সেনাবাহিনী, আলাদা জাতিসত্ত্বার পরিচয় দেয়। সুতরাং বিশ্বাসগত দিক থেকে প্রত্যেকেই আল্লাহ, রসুল (সা.), কোর’আনের প্রতি বিশ্বাস থাকলেও জাতিগতভাবে আল্লাহর জীবনব্যবস্থা দিয়ে রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবার চলে না। এক কথায় বর্তমান মুসলিমবিশ্ব বিশ্বাসগত দিক থেকে পাক্কা ঈমানদার হলেও জাগতিকভাবে, সামষ্টিকভাবে কার্যত মো’মেন নয়।
এবার আসি কা’ফেরের সংজ্ঞায়,
কাফের কারা?
খুব সহজভাবে বলতে গেলে, মো’মেনের এই সংজ্ঞায় যারা নেই তারাই কাফের। কারণ মানুষ মাত্র দুই প্রকার যা শুরুতেই বলেছি। তারপরও আল্লাহ কাফেরের সংজ্ঞা স্পষ্টভাষায় আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছেন। আমরা অনেকে মনে করি যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না, ইসলামবিদ্বেষী বা যারা মুসলিম নয় তারাই কাফির। কিন্তু এই ধারণা সঠিক নয়। বরং আল্লাহকে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও একজন ব্যক্তি বা একটি জনগোষ্ঠী কাফেরে পর্যবসিত হতে পারে যদি তারা আল্লাহর হুকুম প্রত্যাখ্যান করে। ঠিক যেমনটা রসুল (সা.) আগমনের পূর্বে মক্কার আইয়্যামে জাহিলিয়াতের জনগোষ্ঠী করেছিল। আল্লাহর হুকুম কেবল নামাজ, রোজা নয়। তিনি মানুষের ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি এক কথায় তার সমগ্র জীবন কীভাবে চলবে সকল বিষয়েই হুকুম বিধান দিয়েছেন। মানুষ ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর হুকুম (নামাজ, রোজা ইত্যাদি) পালন করেও, জাতীয় জীবনের হুকুমগুলো প্রত্যাখ্যান করলে সে কাফের হয়ে যাবে। অর্থাৎ জীবনের যে কোনো অঙ্গনে আল্লাহর হুকুম যারা প্রত্যাখান করবে, আল্লাহকে ইলাহ (হুকুমদাতা) হিসেবে অস্বীকার করবে, তারা আল্লাহর কাছে কাফের হিসেবে বিবেচিত হবে, তাদের ধর্ম পরিচয় যেটাই হোক না কেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ এভাবে বলেছেন-
‘যারা আল্লাহর নাজিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার ফয়সালা দেয় না তারা কাফির।’ (সুরা মায়িদা : আয়াত-৪৪)
এই আয়াত দ্বারা আল্লাহ কাফের বলতে কাদের বুঝিয়েছেন আরেকটু খেয়াল করুন। আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে শত শত আয়াতে আদেশ-নিষেধ করেছেন। যা করতে বলেছেন তা হলো হালাল, ফরজ। যা নিষেধ করেছেন তা আমাদের জন্য হারাম, নিষিদ্ধ। আল্লাহ সুদ হারাম করেছেন, ব্যভিচার হারাম করেছেন, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, সমাজে ফেতনা সৃষ্টি করা হারাম করেছেন। আবার আদেশ করেছেন- যাকাত প্রতিষ্ঠা করতে, দীন কায়েম করতে, উত্তরাধিকারের সম্পদ যথাযথভাবে বণ্টন করতে, চুরি, ব্যভিচারের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করতে। ফরজ করেছেন- নামাজ, রোজা, হজ, যাকাত, জেহাদ, কেতাল, কেসাস ইত্যাদি। এসব বিধান দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন সমাজে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারে। সমাজে যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, ফেতনা সৃষ্টি না হয় সেজন্য আল্লাহ ঐশি কেতাবের মাধ্যমে এসব দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। যারা তা পালন করবে তারা শান্তিতে থাকবে। যারা অস্বীকার করবে তারা সমাজকে অশান্তিতে রাখবে। কাফের মানে যে শুধু অবিশ্বাসী তা নয় বরং আল্লাহর বিধানকে পুরোপুরি অস্বীকারকারী। বস্তুত আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে অন্য যে কারও বিধান মেনে নেওয়াই কুফর। যারা কুফরি করে তারা কাফের। মুসলিম নামক জনগোষ্ঠী বর্তমানে আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস, ভক্তি, শ্রদ্ধা থাকলেও জাতীয় জীবনে আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠিত না থাকার দরুন কার্যত কাফেরে পর্যবসিত হয়ে আছে।
যদিও মো’মেন ও কাফের ছাড়া মানুষের মধ্যে অন্য কোনো প্রকারভেদ থাকার কথা নয়। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, মুসলমান নামক জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিরাট একটি অংশ এই দুইয়ের মধ্যবর্তী স্থানে পড়ে রয়েছে। স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে যারা আল্লাহর বিধান পুরোপুরি মেনে নিবে এবং জান-মাল দিয়ে এই বিধানকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সংগ্রাম করবে তারা মো’মেন এবং যারা আল্লাহর বিধানকে পুরোপুরি অস্বীকার করবে এবং কখনোই যেন তওহীদ প্রতিষ্ঠা না হয় সেজন্য সর্বাত্মক ষড়যন্ত্র করবে তারা কাফের। কিন্তু মুসলিমদের মধ্যে বিরাট একটি জনগোষ্ঠী সুবিধামত কিছু আল্লাহর হুকুম পালন করেন এবং কিছু মানুষের হুকুম পালন করেন। অর্থাৎ আল্লাহ যেটা আদেশ-নিষেধ করেছেন সেটা অনুসরণ না করে তার বিপরীতমুখী বিধান পার্লামেন্টের মাধ্যমে আইন পাশ করে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের রায় নিয়ে জাতীয় জীবনে কার্যকর করেছেন। এদের কর্মকেই আল্লাহ শেরক বলেছেন এবং তিনি কখনও শেরকের গোনাহ ক্ষমা করবেন না।
মোশরেক কারা?
‘মোশরেক’ শব্দটি এসেছে ‘শেরক’ থেকে। শেরক মানে হচ্ছে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক বা অংশীদার করা। শেরক বলতে আমরা সাধারণত বুঝি- একদিকে আল্লাহর উপাসনা করা, অপরদিকে অন্য কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ মনে করে তারও উপাসনা/আরাধনা করা। কেউ এমনটা করলে সে অবশ্যই শেরক করলো। কিন্তু শেরক কেবল এটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং যারা কিছু ব্যাপারে আল্লাহকে হুকুমদাতা হিসাবে মানলো আর কিছু ব্যাপারে মানুষের তৈরি হুকুম বিধান মানলো তারাও শেরক করল অর্থাৎ মোশরেক হয়ে গেল। এদের ব্যাপারে পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ নিজে বলেছেন-
তবে কি তোমরা কিতাবের (অর্থাৎ আল্লাহর হুকুমের) কিছু অংশ মানো আর কিছু অংশ প্রত্যাখ্যান করো? তোমাদের মধ্যে যারা এমনটা করে তাদের একমাত্র প্রতিফল দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ও অপমান এবং কেয়ামতের দিন তাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে কঠিনতম শাস্তির দিকে। (সুরা বাকারা- আয়াত ৮৫)।
সুতরাং মুসলিম দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও সমগ্র দুনিয়ায় আমরা কেন লাঞ্ছিত অপমানিত হচ্ছি তার কারণ নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।
সুধী পাঠক, এবার নিচের দেওয়া ছকটি খেয়াল করুন- বর্তমানে আমরা কার হুকুম মেনে আমাদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনা করছি।

অর্থাৎ ব্যক্তিগত জীবনের সামান্য আমল-আখলাকের বাইরে অন্য সকল ক্ষেত্রে আমরা আল্লাহর হুকুম প্রত্যাখ্যান করেছি। কোর’আনের বিধান প্রত্যাখ্যান করে আমরা মানুষের তৈরি বিধান দিয়ে সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, আইন-আদালত, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্যসহ সব কিছু পরিচালনা করছি। অর্থাৎ আল্লাহকে ইলাহ বা হুকুমদাতার জায়গা থেকে সরিয়ে মানুষকে হুকুমদাতার আসনে বসিয়েছি।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে-
- আমরা ইলাহ হিসেবে কাকে মেনে নিয়েছি? আল্লাহকে নাকি মানুষকে?
- যদি আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে না মানি, তাহলে আমরা কি কলেমার ঘোষণায় (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) অটল রইলাম?
- যদি কলেমার ঘোষণায় অটল না থাকি তাহলে কি আমরা মো’মেন রইলাম?
- নাকি আল্লাহর দৃষ্টিতে আমরা কাফের ও মোশরেক হয়ে গেলাম?
- এই প্রশ্নগুলোর উত্তর পেতে একটু চিন্তা করুন। আশা করি উত্তর পেয়ে যাবেন।
সুধী পাঠক পরিশেষে এটুকুই বলতে হয়, আজকে সারা পৃথিবী অন্যায়-অশান্তিতে পূর্ণ হয়ে ওঠেছে। জুলুম, দুঃশাসন, যুদ্ধ-রক্তপাত, খুন, ধর্ষণ, রাহাজানিতে ভরে গেছে গোটা বিশ্ব। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের অবস্থাও ভয়ানক শোচনীয়। স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু মানুষ সত্যিকার অর্থে মুক্তি পায়নি। সর্বত্র কেবল দুর্নীতি, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক হয়রানি, ক্ষমতাবানদের দৌরাত্ম্য, ধনী-গরীবে বৈষম্য, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, ক্ষুধা, দারিদ্র্য। অধিকাংশ মানুষের জন্য বউ-বাচ্চা নিয়ে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত খাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বৃদ্ধ পিতা-মাতার সঠিক চিকিৎসা দেয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সমাজে অশ্লীলতা ভয়বহ মাত্রায় বেড়েছে। পিতার কাছে সন্তান, সন্তানের কাছে পিতা নিরাপদ নয়। পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে গেছে। বেকারত্বের কারণে প্রতিটি মানুষ নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। চারদিকে মানুষের দুর্দশা আর কান্না। এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে প্রতিটি মানুষ আজ মুক্তি চায়।
কিন্তু আপনি কি কখনো ভেবেছেন, আজকের এই অসহনীয় পরিস্থিতির কারণ কী? কি কারণে আমাদের এই নিদারুণ পরিণতি?
আমরা হেযবুত তওহীদ বলছি, আমাদের এই করুণ পরিণতির একমাত্র কারণ, আমরা আল্লাহর হুকুম প্রত্যাখ্যান করেছি। আমরা আল্লাহর দেয়া জীবনব্যবস্থা অর্থাৎ ইসলামের পরিবর্তে মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থাকে গ্রহণ করেছি। অথচ ব্যক্তিগত জীবনে আমরা আল্লাহকে বিশ্বাস করি এবং আল্লাহর উপাসনা করি। এভাবে আমরা আল্লাহকেও কিছু বিষয়ে মানি, আবার জাতীয় রাষ্ট্রীয় জীবনে মানুষের বিধান পুরোপুরি মানি। এটাই শেরক। আমরা আজকে আল্লাহর সাথে মানুষকে শরিক করার শাস্তি ভোগ করছি। পাশাপাশি আল্লাহর হুকুম প্রত্যাখ্যানের মাধ্যমে কুফর করে আল্লাহর গজবে পতিত হয়েছি। আমাদের ইহকাল ও পরকাল দুটোই ধ্বংস হয়ে গেছে।
এই অবস্থায় আমরা হেযবুত তওহীদ এদেশের প্রত্যেক ইসলামবিশ্বাসী মানুষকে আহ্বান করছি, আসুন আমরা সকলে মিলে আল্লাহর হুকুম বিধান মেনে নেই। আসুন আমাদের সমাজ, অর্থনীতি, আইন-আদালত, রাষ্ট্রব্যবস্থাসহ প্রতিটি অঙ্গনে আল্লাহর দেয়া সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করি। একমাত্র হুকুমদাতা আল্লাহর পবিত্র গ্রন্থ কোর’আনের আলোকে আমাদের সবকিছু ঢেলে সাজাই। তবেই কেবল আমরা আল্লাহর দরবারে মো’মেন হিসেবে কবুল হবো। তবেই কেবল চলমান সমস্ত অন্যায়, অশান্তি দূর হয়ে ন্যায়, শান্তি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং পরকালে আমাদের মুক্তি মিলবে। আল্লাহ ওয়াদা করেছেন তিনি আমাদের পৃথিবীর কর্তৃত্ব দিবেন যদি আমরা মো’মেন হই। আর মো’মেন হওয়ার সংজ্ঞা, মো’মেনের গুণাবলী আল্লাহর ঐশি কেতাবে লিপিবদ্ধ আছে। সুতরাং মুসলিম জাতির এই দুর্দশা যদি ঘুচতে হয়, সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিদের বিরুদ্ধে যদি মাথা উচু করে দাঁড়াতে হয়, ইবলিসের বিরুদ্ধে আল্লাহকে যদি বিজয়ী করতে হয় তাহলে আমাদের মো’মেন হতে হবে। মো’মেনদের ওয়ালী (অভিভাবক) আল্লাহ নিজে। মো’মেনরা কখনো পরাজিত হতে পারে না। আজকে মুসলিম জাতি অন্য জাতি দ্বারা নিগৃহীত, নিপীড়ত, নির্যাতিত, পরাজিত। তাদের পরাজয়ই প্রমাণ করে দেয় আমরা বিরাট পণ্ডিত হতে পারলেও, নামাজি, রোজাদার হলেও, সংখ্যায় বিশ্বের ২য় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হলেও মো’মেন হতে পারি নি।
তাই সমাজ থেকে সর্বরকম অন্যায়-অশান্তি নির্মূল করতে হলে আমাদের সর্বপ্রথম মো’মেন হতে হবে। এই জনগোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে মো’মেন হওয়ার জন্যই আহ্বান করে যাচ্ছে হেযবুত তওহীদ। আসুন এই সংগ্রামে আমরা সবাই সামিল হই। আল্লাহর দেওয়া সংজ্ঞা মোতাবেক নিজেরা মো’মেন হিসেবে গড়ে তুলি এবং এই অশান্তিপূর্ণ সমাজকে শান্তিময় করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়ে সংগ্রাম করি।
[ বিস্তারিত জানতে বা যোগাযোগের জন্য সরাসরি কল বা হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠান: ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৬২১৪৩৪২১৩ ]



















