বাংলাদেশ বর্তমানে এক কঠিন ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। একদিকে দীর্ঘ ৯ মাসের দরকষাকষি শেষে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সই হওয়া নতুন বাণিজ্য চুক্তি (এআরটি) নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। অন্যদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের চাপে পড়ে রাশিয়ার তেল আমদানির জন্য ওয়াশিংটনের দ্বারে কড়া নাড়ছে ঢাকা। ২০২৬ সালের এই বিশেষ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের সামনে এখন বড় প্রশ্ন- আমেরিকার সাথে এই চুক্তি কি আমাদের অর্থনীতির জন্য আর্শীবাদ, নাকি কৌশলে সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দেওয়ার এক দলিল?
২০২৫ সালের শুরুতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক নতুন ঝড়ের সৃষ্টি করে। ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অংশ হিসেবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের ওপর ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে, গত ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত হয় ‘এগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ বা এআরটি। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ওপর আরোপিত শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৯ শতাংশে দাঁড়াল। ১ শতাংশ শুল্ক কমানোর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে ‘শূন্য শুল্ক’ সুবিধার প্রতিশ্রুতি মিলেছে।
উপরের দিক থেকে দেখলে ১ শতাংশ শুল্ক কমানো বা তুলা ব্যবহারে শুল্কমুক্ত সুবিধাকে বড় সাফল্য মনে হতে পারে। তবে ৩২ পৃষ্ঠার এই চুক্তির গভীরে তাকালে দেখা যায় ভিন্ন এক চিত্র। বিশেষজ্ঞরা একে বলছেন ‘একতরফা’ চুক্তি। কারণ, এই সামান্য সুবিধার বিনিময়ে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আগামী ১৫ বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এলএনজি এবং অন্তত ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিতে হয়েছে। এছাড়া বছরে প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন ডলারের কৃষিপণ্য আমদানির বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, জাতীয় সক্ষমতা বিচার না করে কেন এত বড় অঙ্কের কেনাকাটার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলো?
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

চুক্তির ৪.৩ অনুচ্ছেদটি বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের। এখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যদি চীন বা রাশিয়ার মতো ‘নন-মার্কেট’ দেশগুলোর সাথে কোনো বড় অর্থনৈতিক বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। এর অর্থ হলো, বাংলাদেশের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা অনেকটাই সংকুচিত হয়ে এসেছে। এছাড়াও ডিজিটাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ডাটা বা তথ্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং মার্কিন ডিজিটাল লজিস্টিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের শর্তগুলো আমাদের সাইবার নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
পোশাক খাতের জন্য সবচেয়ে বড় প্রলোভন ছিল মার্কিন তুলা ব্যবহার করলে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া। কিন্তু বাংলাদেশের স্পিনিং মিলগুলো সাধারণত ভারত, ব্রাজিল বা আফ্রিকা থেকে সস্তায় তুলা আমদানি করে। আমেরিকান তুলা মানেই চড়া দাম এবং লম্বা সময় ধরে জাহাজীকরণের অপেক্ষা। এখন ১৯ শতাংশ শুল্ক বাঁচাতে গিয়ে যদি বেশি দামি তুলা দিয়ে পোশাক তৈরি করতে হয়, তবে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাকের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। এতে বিদেশি ক্রেতারা অন্য কোনো সস্তা উৎসের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন। ফলে এই সুবিধাটি শেষ পর্যন্ত শুভঙ্করের ফাঁকি হয়ে দাঁড়াবে কি না, তা নিয়ে ব্যবসায়ীদের মধ্যে গভীর ধোঁয়াশা রয়েছে।
বাণিজ্য চুক্তির বিতর্কের মধ্যেই নতুন এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে জ্বালানি তেলের আকাশচুম্বী দাম। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের ফলে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম। এ অবস্থায় রাশিয়ার সস্তা তেল ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনীতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থাকায় সরাসরি তেল কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
এ প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে রাশিয়ার তেল কেনার জন্য ‘ওয়েভার’ বা বিশেষ ছাড় চেয়েছেন। যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে যে, ভারত যদি রাশিয়ার তেল কেনার অনুমতি পায়, তবে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য কেন সেই সুযোগ থাকবে না?
মার্কিন অনুমতি ছাড়া রাশিয়ার সাথে লেনদেন করলে বাংলাদেশের ওপর ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ বা দ্বিতীয় স্তরের নিষেধাজ্ঞা আসার ভয় থাকে। এর ফলে আমাদের বড় বড় ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক লেনদেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে। এছাড়া রাশিয়ার তেলের জাহাজগুলোতে পশ্চিমা বীমা কোম্পানিগুলো কাভারেজ দিতে চায় না। এ কারণেই সরকার তড়িঘড়ি করে কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে আলোচনার পথ বেছে নিয়েছে। রাশিয়ার তেল আমদানির এই উদ্যোগটি এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে আমেরিকার মর্জির ওপর।
বাণিজ্য চুক্তিটি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও নাগরিক সমাজও উত্তপ্ত। সিপিবিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এই চুক্তিকে সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে এবং তা বাতিলের দাবি জানাচ্ছে। বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরও স্বীকার করেছেন যে, চুক্তির কিছু ধারা পর্যালোচনার সুযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, এই চুক্তির ফলে দেশীয় ওষুধ ও সিরামিক শিল্প বড় ধরনের প্রতিযোগিতার মুখে পড়বে, কারণ মার্কিন পণ্যগুলো এখন শুল্ক ছাড়াই এ দেশে প্রবেশের সুযোগ পাবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন দুই দিকেই লড়াই। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে করা ‘অসম’ বাণিজ্য চুক্তির ধারাগুলো নতুন করে পর্যালোচনা করা, যাতে আমাদের দেশীয় শিল্প ও রাজস্ব আয় সুরক্ষিত থাকে। অন্যদিকে জ্বালানি সংকট সামাল দিতে রাশিয়ার তেলের জন্য ওয়াশিংটনকে রাজি করানো। ভারতের মতো শক্ত কূটনৈতিক অবস্থান না নিলে বাংলাদেশ এই ভূ-রাজনৈতিক খেলায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
আমেরিকার সাথে বাণিজ্য চুক্তি আমাদের বাজারের জন্য একটি সুযোগ হতে পারত, যদি এটি সমমর্যাদার ভিত্তিতে করা হতো। কিন্তু বর্তমান চুক্তিতে প্রাপ্তির চেয়ে ত্যাগ করার তালিকাটিই দীর্ঘতর। ১ শতাংশ শুল্ক কমানোর জন্য আমাদের নীতিনির্ধারণী স্বাধীনতা এবং বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচের প্রতিশ্রুতি কি আদৌ যৌক্তিক?
একইভাবে রাশিয়ার তেলের জন্য আমেরিকার মুখাপেক্ষী হওয়া আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তার ভঙ্গুর দশাই প্রকাশ করে। এখন সময় এসেছে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৈচিত্র্যময় বাজার খোঁজার। একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি ও শক্ত কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমেই কেবল এই সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। অন্যথায়, দরজা খোলা রেখে ঘরের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে তুলে দেওয়ার যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি বয়ে আনতে পারে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট।



















