মুখলেছুর রহমান সুমন:
বাংলাদেশের রাজনীতিকে মোটাদাগে দু’টি রেজিম বা ব্লকে ভাগ করা যায়। একটি পাকিস্তানবিরোধী বা পাকিস্তানবিদ্বেষী। আরেকটি হচ্ছে ভারতবিরোধী বা ভারতবিদ্বেষী। যারা পাকিস্তানবিরোধী রাজনীতি করেন তাদেরকে কেউ কেউ ‘ভারতপ্রেমি’ ট্যাগ দেন, আর ভারতবিরোধীদেরকে দেন ‘পাকিস্তানপ্রেমি’ ট্যাগ।
যাই হোক, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই যে ভারত ও পাকিস্তানকেন্দ্রিক ট্যাগিং, এটা একটা প্রতিষ্ঠিত বাস্তবতা। নির্বাচনগুলোর আগে ‘অমুক দল পাকিস্তানের দালাল’, ‘অমুক দল ভারতের কাছে দেশ বিক্রি করে দেবে’, এরকম বক্তব্য হরহামেশা শোনা যায়। ভোটের মাঠে যার একটা প্রভাবও পড়ে।
তো আমাদের এখানে দুটি ভিন্ন দেশকে নিয়ে এই যে চর্চা, এর পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক কারণ আছে। পাকিস্তানের ব্যাপারটা তো পরিষ্কার- মুক্তিযুদ্ধপূর্ব ও মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটনাবলি। অন্যদিকে ভারতবিদ্বেষী মনোভাবের কারণটা আরো পুরানো। সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই পরিকল্পিতভাবে এই উপমহাদেশের হিন্দুদের মধ্য মুসলিমবিদ্বেষ এবং মুসলিমদের মধ্যে হিন্দুবিদ্বেষ ঢুকানো হয়েছ। মূলত সেই হিন্দুবিদ্বেষই একসময় ভারতবিদ্বেষে রূপান্তরিত হয়েছে।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

তবে আমি মনে করি, আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাইরের দুটি দেশকে টেনে ট্যাগিং করার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ- আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক শুন্যতা। তারা নিজেরা যখন ব্যর্থ হয় তখন অন্যকে নিয়ে চর্চা করতে হয়।
ধরুন- আওয়ামী লীগের কথা। স্বাধীন বাংলাদেশে সবচেয়ে লম্বা সময় তারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। সেই হিসেবে নিজেদেরকে বাংলাদেশের জন্য ‘সঠিক নেতৃত্ব’ হিসেবে প্রমাণ করার সুযোগটাও তারা সবচেয়ে বেশি পেয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কি তা প্রমাণ করতে পেরেছে?
বিএনপির ক্ষেত্রেও এই একই প্রশ্ন থেকে যায়। আর জামায়াতে ইসলামি তো রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগই পায় নি। যা প্রমাণ করে তারা মানুষের আস্থা অর্জনে আরো বেশি ব্যর্থ।
কথা হচ্ছিল বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনীতি নিয়ে। একটি রাজনৈতিক দল যদি আদর্শিকভাবে শক্তিশালী হয়, মানুষ যদি তাদের উপর আস্থা রাখে এবং বাংলাদেশ পরিচালনায় তাদেরকে যোগ্য মনে করে, তাহলে সস্তা রাজনৈতিক বয়ান হিসেবে পরচর্চা, ‘পরদেশ নিয়ে চর্চা’র কোনো প্রয়োজন থাকে না।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বাংলাদেশের যে ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা, এখানে ভারতবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে ফায়দা কী? আমরা কি প্রতিবেশী রাষ্ট্রটির সাথে সব সম্পর্ক গুটিয়ে নিতে পারব? যদি এরকম কিছু সম্ভব হতো, তাহলে সদ্যবিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার ভারতের সাথে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া চুক্তিগুলো থেকে সরে আসতো। কিন্তু তারা একটা চুক্তিও বাতিল করে নি। এমনকি গত নির্বাচনের আগে একটি ভারতীয় গণমাধ্যমকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামির আমির বলেছেন- “আমরা ক্ষমতায় গেলে ভারতের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেব।” বাংলাদেশের সবচেয়ে ভারতবিদ্বেষী দলটির প্রধান যখন এ কথা বলেন, তখন প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে নিজেদের সুসম্পর্কের বিষয়টি অপরিহার্য হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।
আমার লেখা পড়ে পাঠকেরা যেন এমনটা মনে না করেন যে, আমি ভারতের প্রতি আবেগী কিংবা ভারতের ব্যাপারে ভীত। আমি মোটেও তা নই। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিদ্বেষকে যেভাবে উস্কানো হয়েছে, আবার ওপাড়ের বাবুরাও যেভাবে বাংলাদেশবিদ্বেষী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, এই পুরো ব্যাপারটাকে আমার কাছে স্বস্তিকর মনে হচ্ছে না। আমাদের বলে নয়, কোনো রাষ্ট্রের জন্যই প্রতিবেশীর সাথে ‘সাপে-নেউলে সম্পর্ক’ স্বস্তিদায়ক হতে পারে না। এটা স্বস্তিকর হতে পারতো, যদি আমরা অন্য কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের কাছ থেকে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা নিতাম এবং তাদের ‘চ্যালা’ হিসেবে এই অঞ্চলে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতাম। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো কোনো বিশ্বশক্তির কাছে মাথা বিক্রি করে নি।
আমি মনে করি, আমাদেরকে এই ভারতবিদ্বেষী রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে বরং নিজেদের হিম্মত কিভাবে বাড়ানো যায়, সেই চিন্তা করা উচিত। এখানে একদল ক্ষমতায় গেলে অন্য দলকে দমিয়ে রাখে। অন্যদলটি আবার ক্ষমতায় আসতে পারলে আগের দলকে পিটিয়ে দেশ ছাড়া করে। এই অনৈক্য ও প্রতিহিংসার চর্চা করে আমরা খুব বেশিদূর আগাতে পারবো না।
কথা হচ্ছে এই প্রতিহিংসা বন্ধের উপায় কী? নিজেদের যে আদর্শিক শুন্যতা সেটা দূর করার উপায় কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে। ঐক্যের সূত্র খুঁজতে হবে। বিভাজনকে ‘না’ বলতে হবে।
[লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ফোন: ০১৭১১০০৫০২৫]



















