ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যদি মনে করে থাকে যে, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যা করার মাধ্যমেই ইরানকে পদাবনত করা যাবে, তবে বিষয়টি আসলে এক বড় ভুল হিসাব। সম্প্রতি প্রভাবশালী সাময়িকী ফরেন পলিসি-র এক নিবন্ধে এমন মন্তব্যই করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের শাসন ব্যবস্থা কোনো একক ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়, বরং এটি একটি সুসংহত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
ব্যক্তি নয়, ‘সিস্টেম’ যখন মূল শক্তি
ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ধারণা ছিল, খামেনিকে হঠাৎ সরিয়ে দেওয়া গেলে বর্তমান ইরানি শাসন ব্যবস্থা ভয়াবহ সংকটে পড়বে। তাদের লক্ষ্য ছিল লিবিয়ায় মুয়াম্মার আল গাদ্দাফির পতন বা সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের ক্ষমতাচ্যুতির পর দেশ দুটিতে যেমন রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল, ইরানেও তেমন পরিস্থিতি তৈরি করা। ওইসব দেশে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কার্যত এক ব্যক্তির সঙ্গে বাঁধা ছিল। কিন্তু ইরানের ইতিহাস ও টিকে থাকার কৌশল সম্পূর্ণ আলাদা।
ইরানে সর্বোচ্চ নেতার পদে ধর্মীয় বৈধতা, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং চূড়ান্ত রাজনৈতিক মীমাংসার ক্ষমতা- সবই একীভূত। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটি ব্যক্তি-নির্ভর। কিন্তু এই দপ্তরের নিচেই রয়েছে নিবিড় ও বহুস্তরীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। এই কাঠামো নেতাকে কেবল সেবা দেয় না, বরং তাকে নিয়ন্ত্রণ ও তদারক করে এবং প্রয়োজনে তাকে ছাড়াই রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে। এটি মূলত একটি ‘বিপ্লবী সিস্টেম’, যা নেতৃত্ব বদলের পরিকল্পনায় বিপুল বিনিয়োগ করেছে।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

ইতিহাস থেকে নেওয়া শিক্ষা
ইরানের রাজনৈতিক আচরণ তাদের ইতিহাসের গভীর পাঠ ছাড়া বোঝা সম্ভব নয়। শতাব্দীজুড়ে ইরান রাষ্ট্রব্যবস্থায় রাজনৈতিক শূন্যতার তিক্ত অভিজ্ঞতা পেয়েছে। কাজার রাজবংশের পতন, ইস্পাহান দখলের পর সাফাভি সাম্রাজ্যের ধস কিংবা নাদির শাহের মৃত্যুর পরের বিশৃঙ্খলা -এসব ঘটনা ইরানিদের শিখিয়েছে যে, স্পষ্ট নেতৃত্ব না থাকলে দেশ ভেঙে পড়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
তাই ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের স্থপতি আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব বিলোপ না করে সেটিকে সিস্টেমের অংশে পরিণত করেন। তিনি সরল ভাষায় বলেছিলেন, “ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে রক্ষা করা যেকোনো ব্যক্তিকে রক্ষার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ; সে ব্যক্তি যত গুরুত্বপূর্ণই হোক।”
শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক রক্ষাকবচ
ইরানের প্রতিটি প্রধান প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে ইতিহাসের নির্দিষ্ট ঝুঁকির জবাব হিসেবে। যেমন:
- গার্ডিয়ান কাউন্সিল: রাজনৈতিক বিচ্যুতি ঠেকাতে এবং আইনকে ইসলামী নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে কাজ করে।
- বিশেষজ্ঞ পরিষদ (Assembly of Experts): সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন ও তদারকের দায়িত্ব পালন করে, যাতে জবাবদিহি নিশ্চিত থাকে।
- এক্সপেডিয়েন্সি কাউন্সিল: প্রাতিষ্ঠানিক অচলাবস্থা নিরসনে এবং উচ্চপর্যায়ের মতভেদ সত্ত্বেও সিস্টেম সচল রাখতে ভূমিকা রাখে।
- আইআরজিসি ও গোয়েন্দা সংস্থা: বিপ্লবকে ভেতরে এবং বাইরে সুরক্ষিত রাখা এবং বিদেশি হুমকি মোকাবিলা করা এদের কাজ।
এই প্রতিষ্ঠানগুলো এমনভাবে তৈরি, যাতে এক অংশ ব্যর্থ হলে অন্য অংশ এগিয়ে আসে।
সংকটে টিকে থাকার প্রমাণ
ইরানের এই সিস্টেম অতীতেও বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে এবং উতরে গেছে। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর হত্যাকাণ্ডের পরও মাত্র ৫০ দিনের কম সময়ে খামেনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৮৯ সালে খোমেনির মৃত্যুর পর, যার সমকক্ষ ধর্মীয় মর্যাদা খামেনির ছিল না, তবুও প্রতিষ্ঠানের ঐক্যমত্যে তিনি সর্বোচ্চ নেতা হন।
সর্বশেষ ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেলে সংবিধানের বিধান সঙ্গে সঙ্গে কার্যকর হয় এবং ক্ষমতা মসৃণভাবে স্থানান্তরিত হয়। এতে প্রমাণ হয়, সংকট ও নেতৃত্ব পরিবর্তন দেশটিতে বিশৃঙ্খলা নয়, বরং নিয়মতান্ত্রিক অনুশীলনে পরিণত হয়েছে।
সংবিধান কী বলে?
ইরানের সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা মারা গেলে বা অক্ষম হলে ক্ষমতা তাৎক্ষণিকভাবে একটি ‘অন্তর্বর্তী পরিষদের’ হাতে ন্যস্ত হবে। এই পরিষদে থাকবেন প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং প্রজ্ঞা পরিষদের একজন জ্যেষ্ঠ আলেম। অর্থাৎ নেতৃত্বশূন্যতা সৃষ্টি হওয়ার কোনো সুযোগ সাংবিধানিকভাবে রাখা হয়নি।
সার্বিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, ইরানের শাসনব্যবস্থা ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হলেও দিনশেষে ‘সিস্টেম’ বা তন্ত্রই সেখানে প্রধান। ফলে নেতৃত্ব সরিয়ে দিয়ে ইরানের পতন ঘটানোর পশ্চিমা পরিকল্পনা বাস্তবে সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।



















