রিয়াদুল হাসান:
বর্তমানে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১ শতাংশ মুসলিম, যার সংখ্যা প্রায় ২২০ কোটি। মুসলিমরা বর্তমানে ভৌগোলিকভাবে মোট ৫৭টি জাতিরাষ্ট্রে বিভক্ত। এই দেশগুলোর মোট আয়তন প্রায় ৩ কোটি ১৬ লক্ষ ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার, যা পৃথিবীর মোট ভূখণ্ডের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ জুড়ে বিস্তৃত। যে জ্বালানি ছাড়া বর্তমান যান্ত্রিক সভ্যতার চাকা অচল- সেই পেট্রোলিয়াম ও গ্যাসের প্রায় ৬৩ শতাংশ এবং পারমাণবিক শক্তির গুরুত্বপূর্ণ উৎস ইউরেনিয়ামের প্রায় ৫৩ শতাংশ মজুদ রয়েছে মুসলিম দেশগুলোতে। এই মুসলিম দেশগুলোর সামরিক ও রিজার্ভ বাহিনীর সৈন্যসংখ্যাই ১.৫ কোটির বেশি। বিশ্বের প্রথম পাঁচটি অস্ত্র আমদানিকারক দেশের মধ্যে তিনটি মুসলিম দেশ – সৌদি আরব, কাতার ও পাকিস্তান।
প্রশ্ন হলো, এত বিপুল জনসংখ্যা, এত প্রাকৃতিক সম্পদ, এত সামরিক শক্তি থাকা সত্ত্বেও কেন আমরা এত দুর্বল, কেন এত অসহায়? কেন আমাদেরকে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল কিনতে আমেরিকার কাছে অনুমতি নিতে হয়? আমাদের কি তেলের অভাব ছিল? আরব রাষ্ট্রগুলোর মাটির নিচে থাকা তেল পাচার হয়ে যাচ্ছে পশ্চিমা প্রভুদের কাছে। ওদিকে ইরানের তেলের ডিপোগুলো আগুনে জ্বলছে সেই প্রভুদেরই ক্ষেপণাস্ত্র হামলায়। কেন ২২ টি আরব দেশের কেন্দ্রে অবস্থিত ফিলিস্তিনে আশি বছর থেকে মুসলমানের রক্তে হোলি খেলছে ইহুদিবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল ও তার দোসর আমেরিকা? কীভাবে একের পর এক দেশ হামলা করে দেশের শাসকদেরকে সপরিবারে হত্যা করছে, হত্যা করছে লক্ষ লক্ষ বেসামরিক মানুষ, অসহায় নারী ও নিরপরাধ শিশুদেরকে? আমাদের পাশের দেশ মায়ানমার থেকে বৌদ্ধ রাখাইনরা লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করে দেশ থেকে উচ্ছেদ করে দিয়েছে, নারীদেরকে গণধর্ষণ করেছে। আজ ২২ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে মানবতের জীবনযাপন করছে।
অনৈক্য: মুসলিম বিশ্বের প্রধান দুর্বলতা
আমরা মুসলিমরা নিজেদের শ্রেষ্ঠ জাতি (সুরা ইমরান ১১০) বলে গৌরব করি, তাহলে কেন আমাদের এই দুর্দশা? এক কথায় এর উত্তর হচ্ছে, আমাদের অনৈক্য। যদি মুসলিম বিশ্ব ৫৭ টি রাষ্ট্রে বিভক্ত না হয়ে এক রাষ্ট্র হতো তাহলে আমাদের সমস্ত শক্তি ও সম্পদকে নিজেদের জাতীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা যেত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেটা একেবারেই কল্পনাতীত। আমরা আজকে কেউ বাংলাদেশী, কেউ পাকিস্তানী, কেউ সুদানী, কেউ মিশরীয়। আমরা ভিন্ন ভিন্ন দেশের নাগরিক, ভিন্ন ভিন্ন জাতীয়তায় বিশ্বাস করি। ফিলিস্তিন আক্রান্ত হলেও আমাদের কোনো উপায় থাকে না তাদের পাশে দাঁড়ানোর, কারণ প্রতিটি দেশ কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা। আছে নানা আন্তর্জাতিক আইন, চুক্তি ইত্যাদি। মুসলিম ভাইদের দুর্দশা দেখে তাই দেশের মধ্যেই মিছিল বিক্ষোভ করা ছাড়া আর কিছুই আমাদের করার নেই। উপরন্তু মুসলিম দেশগুলোই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত। ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের উপর হামলা করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছে। এছাড়া উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকের বিরুদ্ধে কুয়েত, সৌদি আরবসহ বহু মুসলিম দেশ আন্তর্জাতিক জোটের অংশ হয়ে সামরিক অভিযানে অংশ নেয়।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

কেবল ভৌগোলিক বিভক্তি নয়, আমরা নামে মুসলিম হলেও আমাদের মধ্যে ধর্মীয় বিভক্তির কোনো ইয়ত্তা নেই। আমরা কেউ শিয়া, কেউ সুন্নী, কেউ হানাফি, কেউ হাম্বলি। আমরা কেউ তরিকতপন্থী, কেউ সুফিবাদী। ধর্মীয় আকিদাগত বিভক্তির তালিকার কোনো শেষ নেই। ইসলাম নিয়ে আমাদের দেশে যারা রাজনীতি করে তারাও বহুধাবিভক্ত। গত নির্বাচনে তারা জোটবদ্ধ হয়েও শেষে আসন ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব করে জোট ভেঙে ফেলেছে। আমাদের আলেম ওলামারা কোন আমলে কত সওয়াব তা নিয়ে বয়ান করেন কিন্তু জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার বয়ান করেন না। যখন ইরানে আগ্রাসন হয়, তখন তারা অনেকেই বলেন শিয়ারা কাফের। একইভাবে যখন সুন্নী সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরাকে-আফগানে হামলা হয়, ইরান মুখ ফিরিয়ে থাকে।
ঐক্যবদ্ধ হওয়া আল্লাহর হুকুম
কিন্তু আল্লাহ তো বলেছেন তোমরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহর রজ্জুকে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্্ন হয়ো না (সুরা ইমরান ১০৩)। নামাজ রোজা যদি ফরজ হয় তাহলে ঐক্যবদ্ধ হওয়াও তো ফরজ। সে কথাটি কেউ বলছেন না। আল্লাহ বলেছেন, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের আনুগত্য কর এবং নিজেদের মধ্যে বিবাদ করো না; করলে তোমরা সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের শক্তি বিলুপ্ত হবে (সুরা আনফাল ৪৬)। আর আল্লাহর রসুল বলেছেন, সমগ্র মুসলিম একটি দেহের ন্যায়, যেমন দেহের এক অঙ্গে আঘাত পেলে সমগ্র দেহই পীড়িত হয় (নুমান বিন বশির রা. থেকে বোখারি, মুসলিম)। বিদায় হজ্বের ভাষণেও তিনি মুসলমানদের উদ্দেশে বলেন- প্রত্যেক মুসলমান অন্য মুসলমানের ভাই। তাই কোনো মুসলমানের জন্য তার ভাইয়ের সম্পদ বৈধ নয়, যদি না সে স্বেচ্ছায় তা দেয়। তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ এবং তোমাদের সম্মান- এই দিন, এই মাস ও এই শহরের মতোই পবিত্র, হারাম।
মুসলিম বিশ্বের বর্তমান দুরবস্থা
আফ্রিকার আটলান্টিক উপকূল থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ ফিলিপাইন পর্যন্ত, উত্তরে মধ্য এশিয়ার বিশাল তৃণভূমি অঞ্চল কাজাকিস্তান থেকে ভারত মহাসাগরের মালদ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভূখণ্ড জুড়ে ২২০ কোটি মুসলিম এক মরা লাশের মতো পড়ে আছে। আর যে যেভাবে পারছে তাকে লাথি মারছে, পিটাচ্ছে। আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো মুসলিমদেরকে মারার জন্য একে অপরকে ডেকে আনছে। ৩২ টি পশ্চিমা দেশ মিলে ন্যাটো (Nato) নামে একটি শক্তিশালী সামরিক জোট করেছে যার মূল নীতিই হলো- একজনের উপর আক্রমণ মানেই সবার উপর আক্রমণ। ৯/১১-এর পর আমরা এই নীতির বাস্তবায়ন স্পষ্টভাবে দেখেছি। অথচ মুসলিম বিশ্বের ৫৭টি দেশের মধ্যে কোনো সামরিক জোট গড়ে তোলা যায়নি। মুসলিম বিশ্বের বড় দুটো সংগঠন ওআইসি ও আরবলীগ। দুটো সংস্থাই মূলত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য গঠিত। এদের কোনো সামরিক উদ্দেশ্য নেই। যখন কোনো মুসলিম দেশ আক্রান্ত হয়, এই সংস্থাগুলো শুধু বৈঠক করে, নিন্দা প্রস্তাব পাস করে- কোনো কার্যকর সামরিক পদক্ষেপ বা অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেয় না। অনেক সময় প্রতিবেশী মুসলিম দেশ থেকে আসা উদ্বাস্তুদেরকেও আশ্রয় দেয় না, বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন, ওমান ইত্যাদি আরব উপসাগরীয় দেশগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো শরণার্থীকেই জায়গা দেয় না। উল্টো এদের অস্ত্রশস্ত্র মুসলিমদেরই বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয় যেমন ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদি আরবের ভূমিকা। তাদের নেতৃত্বেই ৯/১০ টি আরব দেশ কোয়ালিশন করে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে চলমান এই যুদ্ধে প্রত্যক্ষ হামলা ও দুর্ভিক্ষ, অপুষ্টি, রোগ ও চিকিৎসার অভাব ৪ লক্ষাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছে যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু।
মুক্তির পথ কী?
মুসলিম বিশ্বের এই লজ্জাজনক ও করুণ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য সাধারণ মানুষ এখন পথ খুঁজছে। হ্যাঁ, পথ আছে – চূড়ান্ত ধ্বংস থেকে বাঁচার একমাত্র পথ হলো ঐক্যবদ্ধ হওয়া। আর এই ঐক্যের সূত্র বা মূল ভিত্তি হতে হবে একমাত্র তওহীদ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ যার অর্থ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কোনো হুকুমদাতা নেই। আমাদেরকে জীবনের সর্ব অঙ্গনে কেবলমাত্র আল্লাহকেই একমাত্র বিধানদাতা ও প্রভু হিসাবে গ্রহণ করতে হবে। পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমাদেরকে একজন নেতার নেতৃত্বে, একটি আদর্শ বুকে নিয়ে, এক কর্মসূচিতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এই ঐক্য শেখানোর জন্যই আমাদেরকে আল্লাহ কাবাকে করেছেন ঐক্যের প্রতীক। কথা ছিল প্রতি বছর একবার কাবা প্রাঙ্গণে গিয়ে আমরা মিলিত হবো, আমাদের যাবতীয় সংকট সমাধানের জন্য আলোচনা করবে। সেই কাবাতে আমরা হজ করতে যাই ঠিকই, আমাদের সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা মানবিক সংকটের সমাধানের জন্য যাই জাতিসংঘ, যাই লন্ডন, ওয়াশিংটন বা মস্কো।
আমরা তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও জীবনযাপন পদ্ধতিকে শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি হিসেবে বিশ্বাস করছি এবং তাদের গণতন্ত্র, পুঁজিবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্যবাদের পূজা করছি। আমরা উপাসনা করি আল্লাহর, কিন্তু আমাদের হুকুমদাতা (ইলাহ), প্রভু (রব) ও শাসক (মালিক) হলো পশ্চিমা পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলো। আমাদেরকে এখন বাঁচতে হলে এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, আমরা আল্লাহ ছাড়া আর কারো হুকুম মানবো না। জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে কোর’আনের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিধান আমরা মানবো না। এটাই হলো তওহীদ, এটাই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, এটাই দীনুল ইসলামের ভিত্তি। আমাদেরকে এখন সকল রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আদর্শগত বিভাজন, ভৌগোলিক জাতিগত বিভাজন, ফেরকা-মাজহাব-তরিকাগত বিভক্তি এবং সকল মাসলা-মাসায়েলগত মতভেদকে ত্যাগ করে, একমাত্র তওহীদের ভিত্তিতে দৃঢ়পদ হয়ে এক উম্মাহ হিসাবে দাঁড়াতে হবে।
[লেখক: রিয়াদুল হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ফোন/হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৬৭০১৭৪৬৪৩, ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৬১৭-৩২৯৩৯২]



















