মুস্তাফিজ শিহাব:
বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে আজ একটি কঠিন কিন্তু অনিবার্য প্রশ্ন আমাদের সামনে আসে- আজ মুসলিম উম্মাহর এমন দুর্দশা কেন? কেন তারা সর্বত্র পরাজিত, নিপীড়িত ও লাঞ্ছিত? কেন তাদেরকে সকল দিক থেকে আঘাত করা হচ্ছে, তাদের একের পর এক দেশ ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে, কিন্তু তারা কিছুই করতে পারছে না? যদিও ব্যক্তিগত জীবনে তারা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভ- ঈমান, নামাজ, যাকাত, হজ ও সওম ইত্যাদি সবগুলোই পালন করছে। তাই আজকের এ সময়ে এর কারণ অন্বেষণ করা যৌক্তিকভাবেই অতি আবশ্যক।
প্রকৃত কারণ বর্তমানের মুসলমানরা ইসলামের সবথেকে মৌলিক ও অপরিহার্য দুটি বিষয় তাদের জীবন থেকে বাদ দিয়েছেন। প্রথমটি তওহীদভিত্তিক পূর্ণাঙ্গ দীন- অর্থাৎ তারা আল্লাহ প্রদত্ত ইসলামের সামগ্রিক জীবনবিধান কে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত দিককে আঁকড়ে ধরে আছে। তারা ইসলামকে ব্যক্তিগত গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ করার মাধ্যমে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অঙ্গনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্রিটিশ তথা পশ্চিমাদের তন্ত্র-মন্ত্রকে স্বীকার করে নিয়েছে। দ্বিতীয়টি হল জেহাদ- অর্থাৎ আল্লাহর দেয়া জীবন বিধানকে সামগ্রিক জীবনে প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা করার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম। ইতিহাসের দিকে তাকালেই আমরা দেখতে পাই, মুসলমানদের আদর্শিক দৃঢ়তা ও সামরিক শক্তিই একসময় তাদেরকে পুরো পৃথিবীতে সম্মানের আসনে আসীন করেছিল। তারা ছিল পুরো বিশ্বের সামনে অনুসরনীয় ও নেতৃত্ব পর্যায়ের এক অপ্রতিরোধ্য জাতি। আর যখনই তারা এ দুটি বিষয়কে তাদের জীবন থেকে বাদ দিয়েছে তখন থেকেই অন্যান্য জাতিদের গোলামে পরিণত হয়েছে।
সমকালীন বিশ্ব ও মুসলিম উম্মাহর অসহায়ত্ব
বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে তাকালে এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ আক্রমণে মুসলিশ বিশ্বের বিভিন্ন স্থান আজ আক্রান্ত। ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরাক, সিরিয়াসহ বিভিন্ন জনপদ ইতোমধ্যেই ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। মানবসভ্যতার সুবর্ণ অতীতের ধারক বাহক ইরানের প্রাচীন স্থাপত্যকীর্তি ও শতবর্ষী মসজিদগুলোও আজ মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে। গাজায় প্রায় ২৪ লক্ষ মানুষ আজ নিজেদের মাটিতেই উদ্বাস্তুর মত জীবনযাপন করছে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারেও একই ঘটনা ঘটেছে।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা

কিন্তু সংখ্যার বিচারে আমরা নগন্য নই। বিশ্বের প্রায় ২৪০ কোটি মানুষ মুসলমান। আমরা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩১ শতাংশ। প্রায় ৫৭টি রাষ্ট্র মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে যার সম্মিলিত আয়তন ৩ কোটি ২২ লক্ষ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি। তবুও আমরা আমাদের রক্ষা করতে পারছি না। তাই মুসলিম জাতির এ ক্রান্তিলগ্নে আচার-সর্বস্ব ইসলামকে বাদ দিয়ে রসুলের (স.) আনীত প্রকৃত ইসলামকে গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবী। আর সে ইসলামকে জানতে হলে আমাদের রসুলের (স.) জীবন ও ইসলামের সঠিক আকিদা সম্পর্কে জানতে হবে।
রসুল (স.)-এর আগমনের মূল উদ্দেশ্য ও ইসলামের সঠিক আকিদা
যেকোনো ব্যবস্থার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। একটি কলমের সার্থকতা যেমন তার লেখায়, তেমনি ইসলামেরও একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও একটি সুস্পষ্ট উদ্দেশ্য রয়েছে। কিন্তু বর্তমানে আমরা সে প্রকৃত উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা পালন করে যাচ্ছি। তাহলে সে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী? পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহ তিনটি পৃথক স্থানে রসুলের (স.) আগমনের উদ্দেশ্য অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, “তিনিই সেই সত্তা, যিনি তাঁর রসুলকে হেদায়াহ (সঠিক পথ নির্দেশনা) ও সত্য দীন (জীবনব্যবস্থা) দিয়ে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি একে অন্য সকল দীনের ওপর বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত করেন (সুরা আল-ফাতাহ, ৪৮:২৮; সুরা আস-সফ, ৬১:৯; সুরা আত-তাওবাহ, ৯:৩৩)।”
পরিষ্কারভাবে বুঝা যায় যে, আল্লাহ তাঁর রসুলকে (স.) মানবজাতি কীভাবে চললে সঠিক পথে থাকবে, শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার লাভ করবে, তাদের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবন সাফল্যমণ্ডিত হবে- সে দিক নির্দেশনা ও জীবনব্যবস্থা দান করেছেন। এবং শুধুমাত্র দান করেই তিনি ক্ষান্ত হননি, তিনি রসুলকে (স.) দায়িত্ব দিয়েছেন যাতে তিনি এ শান্তি ও ন্যায়পূর্ণ জীবনব্যবস্থাকে অন্যান্য সকল জীবনব্যবস্থার উপর প্রতিষ্ঠা করেন। কারণ আল্লাহ সর্বজ্ঞানী। তিনি আমাদের স্রষ্টা ও হুকুমদাতা। শুধুমাত্র তার ক্ষেত্রেই সম্ভব এ ধরনের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা যার মাধ্যমে মানবজাতি প্রকৃত অর্থেই মুক্তি পাবে। রসুলের (স.) আগমন ও ইসলামের উদ্দেশ্য এটাই। মুসলিম বিশ্ব আজ এ আকিদাবিচ্যুতির কারণেই ইসলামের মূল থেকে দূরে সরে গিয়েছে।
মূলত, ইসলামের মূল শিকড় থেকে আজ মুসলিম জাতি বহুদূরে সরে গেছে।
মূল শিকড় থেকে বিচ্যুতি
বাস্তবতার নিরীখে পর্যালোচনা করলে, ইসলামের মূল দুটি বিষয় তওহীদ ও জেহাদ থেকে বিচ্যুতি আজ মুসলিম বিশ্বকে মূল শিকড় থেকে বিচ্যুত করে দিয়েছে।
সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রসুল (স.) আল্লাহর কাছ থেকে হেদায়াহ অর্থাৎ সঠিক পথ নির্দেশনা স্বরূপ তওহীদের মূলমন্ত্র নিয়ে হাজির হলেন, যে মূলমন্ত্র যুগে যুগে সকল নবী-রসুলদের ক্ষেত্রে একই ছিল, তার মূল বাণী- “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”- অর্থই হচ্ছে, জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে যেখানে আল্লাহর হুকুম ও বিধান রয়েছে সেখানে আল্লাহর কথামত জীবন পরিচালনা করা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা এবং সেখানে আল্লাহর হুকুম বিধান ছাড়া আর কারো হুকুম না মানা। কিন্তু আজ মুসলিম বিশ্বে তওহীদের এ প্রাথমিক স্বীকৃতি হারিয়ে গেছে। মুসলিম বিশ্ব আল্লাহকে বিশ্বাস করলেও তারা আল্লাহকে হুকুমদাতা হিসেবে ভুলে গিয়ে পাশ্চাত্য প্রভুদের নিজেদের হুকুমদাতা হিসেবে মেনে নিয়েছে।
দুটি মৌলিক বিষয়ের প্রথমটি অর্থাৎ তওহীদের মূলমন্ত্র থেকে সরে এসে আজ মুসলিম জাতি কার্যত আল্লাহর সাথে শেরকে লিপ্ত তারা একদিকে ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহর পাঠানো কিছু হুকুম বিধান মানছে কিন্তু সামষ্টিক জীবন থেকে আল্লাহর হুকুম বিধানকে প্রত্যাখ্যান করেছে। দ্বিতীয় মৌলিক বিষয়, হেদায়াহর পাশাপাশি আল্লাহ যে দীন অর্থাৎ জীবনব্যবস্থা আল্লাহর রসুলকে দান করলেন সে দীনকে প্রতিষ্ঠা করার প্রক্রিয়া স্বরূপ আল্লাহ জেহাদ ও কেতালকে নির্ধারিত করে দিলেন। আজ মুসলিম জাতি সে জেহাদ তথা সর্বাত্মক সংগ্রাম করা থেকে নিজেদেরকে বিরত রেখেছে। তারা জেহাদের মাধ্যমে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার বদলে ইসলামে আচার-সর্বস্ব ধর্মে রূপান্তরিত করেছে। তাই বর্তমান সংকটের পেছনে মুসলিম জাতিই মূল দায়ী। তওহীদ ও জেহাদ ত্যাগের ফলেই আজ মুসলিম বিশ্বের উপর এ লা’নত।
মো’মেনের সংজ্ঞা ও আল্লাহর তরফ থেকে বিজয় ঘোষণা
উপরোক্ত আলোচনা থেকে পাঠক অবশ্যই বুঝতে পারছেন যে গলদ কোথায় হয়েছে। মহান আল্লাহ এ দুটি মূল বিষয়বস্তুকে একজন মো’মেন হওয়ার জন্য ফরজ করে দিয়েছেন যাতে এ জাতি এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সবসময় আঁকড়ে ধরে রাখে। যদিও ইবলিসের প্ররোচনায় আজ মুসলিম জাতি সে সত্যকে ভুলে গেছে কিন্ত আজ পুনরায় সময় এসেছে সে সত্যকে তুলে ধরার।
আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে মো’মেনের সংজ্ঞায় বলেন, “তারাই প্রকৃত মো’মেন, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনে এবং পরে তাতে কোনো সন্দেহ পোষণ করে না; আর নিজেদের জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে জেহাদ করে। তারাই সত্যবাদী (সুরা আল-হুজরাত, ৪৯:১৫)।” স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে একজন প্রকৃত মো’মেনে হতে হলে তওহীদের স্বীকৃতির পরপরই জেহাদ করাকে ফরজ করে দেয়া হয়েছে। যদি জীবন ও সম্পদ দিয়ে সর্বাত্মক সংগ্রাম না করে তবে কখনোই একজন ব্যক্তি কখনোই মো’মেন বলে নিজেকে দাবী করতে পারেন না।
আর মহান আল্লাহ মো’মেনদের জন্য বিজয়ের সুখবর দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, “তোমরা হতাশ হয়ো না, নিরাশ হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মো’মেন হও (সুরা আল ইমরান, ৩:১৩৯)।” তাহলে মহান আল্লাহ যেখানে মো’মেনদের জন্য বিজয়কে নিশ্চিত করে দিয়েছেন সেখানে এ জাতি এত বছর ধরে মার খাচ্ছে। তাহলে স্পষ্টতই এ জাতি মো’মেন নয়। আর যদি মো’মনে না হয় তবে পাশ্চাত্যদের মানবরচিত জীবনবিধানকে মেনে নেয়ার ফলে আজ এ জাতি কার্যত কাফের-মোশরেকে পরিণত হয়েছে।। তাই প্রকৃত অর্থেই যদি আমাদের এ দুরাবস্থা থেকে রক্ষা পেতে হয় তবে আমাদের ইসলামের মূলে ফেরত আসতে হবে।
গুরুত্বের বিপর্যয়: মৌলিক ইসলাম বনাম আনুষ্ঠানিকতা
বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনা করলে, আজ গুরুত্ব বা অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে চরম এক বিপর্যয় নেমে এসেছে। সচেতন পাঠকমাত্রই আমার এ কথাকে কখনোই অস্বীকার করতে পারবেন না। সুতরাং আমরা ইসলামের মূল দুটি বিষয়বস্তুকে বাদ দিয়েছি আর দাড়ি, টুপি, পাগড়ি বা লেবাসের মতো বিষয়গুলোকে এক নাম্বারে নিয়ে এসেছি। অথচ এ বিষয়গুলো নিয়ে কোর’আনে কোনো কথাই বলা হয়নি। কিন্তু মূল দুটি বিষয়কে বাদ দেয়ার ফলে আমরা যে লা’নত ডেকে এনেছি তা আমাদের উপলব্ধিতে আসছে না।
পবিত্র কোর’আনে আল্লাহ বলেন: “হে মো’মেনগণ! তোমাদের কী হলো, যখন তোমাদের আল্লাহর রাস্তায় অভিযানে বের হতে বলা হয়, তখন তোমরা মাটির দিকে ঝুঁকে পড়ো? …যদি তোমরা অভিযানে বের না হও, তবে তিনি তোমাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন এবং তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে নিয়ে আসবেন (সুরা আত-তাওবাহ, ৯:৩৮-৩৯)।” এ আয়াত থেকে স্পষ্টভাবে গুরুত্বের ধারাবাহিকতা পরিষ্কার হয়ে যায়। নামাজ না পড়লে বা হজে না গেলে অন্য কোনো জাতি আমাদের ওপর চেপে বসবে- এমন কঠোর হুঁশিয়ারি কোর’আনে নেই। কিন্তু দীন প্রতিষ্ঠার লড়াই বা অভিযানে না বের হলে ‘অন্য জাতি কর্তৃক লাঞ্ছিত হওয়ার’ সরাসরি হুমকি দেয়া হচ্ছে।
গুরুত্বের এ ক্রমধারা বিবেচনায় আমরা যদি পবিত্র কোর’আনে আয়াতগুলোর দিকে তাকাই তাহলে দেখব সেখানে তাওহীদের আলোচনা এসেছে ২২৩ বার, জেহাদ ও কিতালের কথা ১৬৪ বার, সালাত ৬৭ বার, যাকাত ২৯ বার এবং সাওম বা রোজার কথা ২ বার। এছাড়াও বিষয়গুলো নিয়ে বিভিন্ন আয়াতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আলোচনাও যদি হিসেবে করি তবে এ সংখ্যাগুলির মান আরো বেড়ে যাবে। তাহলে এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় ইসলামে কোন বিষয়ের গুরুত্ব কতখানি। অথচ আজ মুসলমানরা নামাজ-রোজা ধরে রাখলেও তওহীদের পূর্ণ স্বীকৃতি ও জেহাদকে পুরোপুরি ত্যাগ করেছে।
জেহাদের গুরুত্ব ও সর্বোচ্চ পুরস্কার
আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে বলেন, “তোমরা তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাও যতক্ষণ না ফেতনা নির্মূল হয় এবং আল্লাহর দীন পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হয় (সুরা আল-বাকারাহ, ২:১৯৩; সুরা আল-আনফাল, ৮:৩৯)।” এ আয়াতে মহান আল্লাহ ফেতনা নির্মূল করার জন্য সর্বাত্মক সংগ্রাম করতে বলেছেন। যদি আমরা রসুল (স.) এর জীবনী দেখি তবে দেখব তিনি তাঁর ১০ বছরের মাদানী জীবনে প্রায় ১০৭টি সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছেন। সাহাবায়ে কেরামগণ পেটে পাথর বেঁধে, গাছের লতাপাতা খেয়ে দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করেছেন। এমনকি নবী করিম (স.) যখন শেষ সময়ে বিশ্রামরত তখনও তিনি উসামা বিন যায়েদ (রা.) কে ডেকে তাঁর হাতে পতাকা তুলে দেন এবং সংগ্রাম চলমান রাখার ঘোষণা দেন। এ সকল ঘটনা পর্যালোচনা করলেই বুঝা যায় যে ইসলামে জেহাদের গুরুত্ব কতটুকু।
আর এ কথা সহজেই অনুমেয়, যে প্রকৃত যোগ্যতা ও লক্ষ্য অর্জন করবে তাকেই সর্বোচ্চ মর্যাদা ও পুরস্কার দেয়া হবে। আল্লাহকে বিজয়ী করার জন্য, আল্লাহর দেয়া শেষ (পূর্ণাঙ্গ দীন) ইসলামকে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যে তাঁর সবথেকে মূল্যাবান জীবনকে কোরবানী করে সেই শহীদ। আর ইসলামে সর্বোচ্চ মর্যাদা ‘শহীদ’দের জন্য। এমনকি মহান আল্লাহ তাঁদেরকে মৃত বলতেও নিষেধ করেছেন। তিনি পবিত্র কোর’আনে বলেন, “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছেন তাদেরকে মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত, কিন্তু তোমরা বুঝ না (সুরা বাকারা, ২:১৫৪)।” এমনকি একই কথার পুনরাবৃত্তি তিনি পরে আবার করেছেন। সুরা আল ইমরানে তিনি বলেন, “যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছেন তাদেরকে মৃত বলো না, বরং তারা জীবিত এবং আমার তরফ থেকে রিযিকপ্রাপ্ত (৩:১৬৯)।”
এছাড়াও আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন: “জান্নাতে প্রবেশের পর কেউ আর দুনিয়ায় ফিরে আসতে চাইবে না, একমাত্র শহীদ ছাড়া। সে দুনিয়ায় ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা করবে যাতে সে দশবার আল্লাহর পথে শহীদ হতে পারে; কারণ সে শহীদের মর্যাদা ও সম্মান দেখেছে (সহীহ বুখারী ও মুসলিম)।”
তাহলে স্পষ্টতই যে কাজ করার মাধ্যমে এমন সম্মান ও মর্যাদা লাভ করা যায় সে কাজের গুরুত্ব নিয়ে আর বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই। কিন্ত দুঃখের বিষয় এখানেই যে মুসলিম জাতি আজ তার এ বিশেষ দায়িত্ব ও অর্জন সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ অবস্থায় রয়েছে।
প্রকৃত পথ ও মুক্তির আহ্বান
পাঠকদের সামনে এতক্ষণ তওহীদ ও জেহাদ প্রসঙ্গ তুলে ধরলাম ও তওহীদের স্বীকৃতি প্রদানের মাধ্যমে জেহাদ করা যে ফরজ সে বিষয়টি কোর’আন হাদিসের আলোকে বর্ণনা করলাম। কিন্তু সমাজে জেহাদ ও কেতালের যে অপব্যাখ্যা প্রচলিত আছে তার অপনোদন না করলে অনেকই আমার এ লেখাকে সে ভ্রান্ত জেহাদের দিকে ‘অনুপ্রাণিত করছি’ হিসেবে ধরে নিতে পারেন। কিন্তু তা নয়। বর্তমানে যেমন ইসলামের মূল হারিয়ে জাতি বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছে তেমনি এ দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে অনেক অপব্যাখাও প্রচলিত আছে আর যার ফলে সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রতার জন্ম হয়েছে।
আজ ভুল আকিদা বা ইসলাম সম্পর্কে সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ধারণার (Comprehensive concept) অভাবের ফলে বিশ্বের নানা প্রান্তে অনেক সংগঠন জেহাদের নামে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে এবং একজন প্রকৃত ইসলামের অনুসারী হিসেবে আমরা তাদেরকে অবশ্যই সমর্থন করি না। তারা যে কর্মসূচি মোতবেক জেহাদ ও কেতাল করছে তা ইসলামের প্রকৃত রূপের সাথে সাংঘর্ষিক। যারাই তওহীদের ভিত্তিতে এ দীন তথা ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য মাঠে নামবে তারা অবশ্যই রসুলের (স.) গৃহিত কর্মসূচী মোতবেক নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে।
আমার জানামতে, একমাত্র হেযবুত তওহীদ নবী করিম (স.) এর গৃহিত কর্মসূচীর মাধ্যমে নিজেদেরকে সাজিয়েছে এবং সে প্রক্রিয়ায় দীন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। সেই প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট পাঁচটি ধাপ বা কর্মসূচি হলো:
১. ঐক্য: সর্বপ্রথম সমগ্র জনগোষ্ঠীকে তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। অথচ উগ্রবাদী সংগঠনগুলো মানুষকে এই তওহীদের ধারণাই দেয় না।
২. শৃঙ্খলা: কঠোর শৃঙ্খলা বা Discipline মেনে চলতে হবে। যার যার ইচ্ছেমত যা খুশি করার কোনো সুযোগ নেই বরং নেতার নেতৃত্বে শৃঙ্খলিত থাকতে হবে এবং শৃঙ্খলা মেনে চললে প্রকৃত অর্থেই উগ্রপন্থি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
৩. আনুগত্য: ঐক্যবদ্ধ জাতির একজন নির্দিষ্ট নেতা থাকবেন এবং তাঁর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য থাকতে হবে।
৪. হেজরত: শিরক ও কুফরভিত্তিক সমাজ থেকে নিজেদের আদর্শিকভাবে আলাদা করা বা হেজরত করা।
৫. জেহাদ: এই চার ধাপ পেরিয়ে এসে চূড়ান্ত পর্যায়ে জান ও মাল দিয়ে আল্লাহর পথে সংগ্রাম বা জিহাদ করা।
এটাই হলো দীন প্রতিষ্ঠার প্রকৃত ও পবিত্র কর্মসূচি। এখানেই অন্যান্য সংগঠনের সাথে হেযবুত তওহীদের বিশাল তফাৎ। তবে যারা আজ ইসলামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে জেহাদ ও কেতাল সম্পর্কে ভুল আকিদা লালন করছেন ও সে অনুযায়ী নিজেদেরকে কোরবানি করছেন, আমরা বিশ্বাস করি, তারা যদি ইসলামের এ প্রকৃত রূপ সম্পর্কে জানতে পারেন তবে আমি নিশ্চিত তারাও নিজেদেরকে ভ্রান্ত পথ থেকে সরিয়ে সঠিক রাস্তায় নিজেদের চেতনাকে ব্যবহার করবেন। কারণ তারাও ইসলাম প্রতিষ্ঠা করতে চান, এ নিমজ্জিত জাতিকে উদ্ধার করতে চান, তাই তারা ইসলামের সঠিক আদর্শকে ধারণ করবে এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
অতএব, দীন প্রতিষ্ঠার যে প্রক্রিয়া তার প্রথম ধাপ হলো, মানুষের কাছে আদর্শটা স্পষ্টভাবে প্রস্তাব করতে হবে। মানুষ সেটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করে একটা সিদ্ধান্ত নেবে। এ ক্ষেত্রে জনগণ সম্পূর্ণ স্বাধীন। তারা চাইলে এ প্রস্তাবকে গ্রহণও করতে পারে, আবার প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। মানুষ এ আদর্শ মেনে নিলে তাদের মনের পরিবর্তন আসবে এবং স্বতঃস্ফূর্তভাবে তখন একটি গণজাগরণের সৃষ্টি হবে। এ গণজাগরণের মাধ্যমেই আসবে জীবনব্যবস্থার বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আমরা, হেযবুত তওহীদে, জনগণকে সে বিপ্লবের দিকেই ডাকছি।
পরিশেষে পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলব, আমরা যদি ব্রিটিশ বা মানবরচিত আইনি কাঠামোর অধীনে থেকে কেবল ব্যক্তিগত কিছু ইবাদত নিয়ে সন্তুষ্ট থাকি এবং তাতেই আমাদের মুক্তি এ আশা নিয়ে জীবন কাটিয়ে দেই তবে আমাদের এই পরাজয় ও লাঞ্ছনা কাটবে না। আমাদের সম্পদ লুট হবে, ইজ্জত লুণ্ঠিত হবে এবং আমরা একটি নিগৃহীত জাতি হিসেবেই থেকে যাব। তাই এই সংকট থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো তওহীদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া এবং জান-মাল দিয়ে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার সে সংগ্রামে শামিল হওয়া, যা রসুল (স.) ও তাঁর সাহাবীরা করেছিলেন। তাই আজ সমগ্র মুসলিম জাতির কাছে আহ্বান থাকবে, আসুন, মো’মেনের প্রকৃত সংজ্ঞায় নিজেদের অন্তর্ভূক্ত করি এবং তওহীদ ও জেহাদের সেই হারানো শক্তি পুনরুদ্ধারে ঐক্যবদ্ধ হই। তবেই দুনিয়া ও আখেরাতে আমাদের মুক্তি ও বিজয় নিশ্চিত হবে।
(লেখক: শিক্ষক ও কলামিস্ট; facebook/glasnikmira13)
মুসলিম উম্মাহর সংকট: শেকড়চ্যুত আদর্শ ও গন্তব্যহীন যাত্রা/মুস্তাফিজ শিহাব

















