শাহাদৎ হোসেন:
বর্তমান বিশ্ব এক অদ্ভুত বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে পশ্চিমা তথাকথিত ‘সভ্য’ জগত মানবাধিকার, নারী স্বাধীনতা এবং শিশু সুরক্ষার বুলি কপচায়, অন্যদিকে তাদেরই শীর্ষস্থানীয় নেতা ও নীতি-নির্ধারকদের ব্যক্তিগত জীবন চরম কদর্যতা ও বিকৃতিতে পূর্ণ। এই স্বঘোষিত মানবতাবাদীরাই নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) -কে নিয়ে নানা কুরুচিকর মন্তব্য করে এবং আম্মা আয়েশা (রা.) এর সাথে তার বিয়ে নিয়ে মিথ্যা ন্যারেটিভ তৈরি করে মানুষের মনে বিভ্রান্তি ছড়ায়। তারা আম্মা আয়েশা (রা.)-এর বিয়ের বিষয়টিকে ‘শিশু নির্যাতনের’ সাথে তুলনা করার দুঃসাহস দেখায়, অথচ এই বিয়ে ছিল তৎকালীন আরবের সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও পবিত্র বিষয়।
মজার ব্যাপার হলো, যারা রসূল (সা.)-এর পবিত্র চরিত্র নিয়ে অপবাদ দেয়, তাদের নিজেদের থলের বিড়াল আজ বেরিয়ে পড়েছে ‘এপস্টেইন ফাইলস’-এর মাধ্যমে। বিশ্ববাসী আজ দেখছে, যারা দিনের আলোয় নারী অধিকারের সবক দেয়, রাতের অন্ধকারে তারা ‘লিটল সেন্ট জেমস’ দ্বীপে গিয়ে কী ধরনের পাশবিক ও পৈশাচিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। আম্মা আয়েশা (রা.)-এর বিয়ের বিষয়টি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং এটি একটি স্বচ্ছ পারিবারিক ও ঐশী নির্দেশনার অংশ। বিশ্লেষকদের মতে, তাঁর বিয়ের বয়স নিয়ে প্রচলিত ধারণাটি অনেক ক্ষেত্রে ভুল উপস্থাপিত হয়েছে।
ইসলামবিদ্বেষীদের জবাব: আম্মা আয়েশার (রা.) বিয়ের বয়স কত ছিল?
১৯০৫ সালের আগ পর্যন্ত মোহাম্মদ (সা.) এর সাথে আয়েশা (রা.) এর বিয়ের বয়স কোনো ইস্যুই ছিল না। ১৯০৫ সালে আমেরিকান স্কলার জোনাথন ব্রাউন সর্বপ্রথম এটা নিয়ে জল ঘোলা করেন। আম্মা আয়েশা (রা.)-এর বিয়ের বয়স নিয়ে ইসলামবিদ্বেষীরা বুখারী শরীফের একটি হাদিসকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, যেখানে ৬ ও ৯ বছরের কথা উল্লেখ আছে। অথচ আধুনিক ঐতিহাসিক ও হাদিস বিশারদগণ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দেখিয়েছেন যে, বিয়ের সময় তিনি প্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন। এ ব্যাপারে প্রামাণ্য বিশ্লেষণ হলো- “ঐতিহাসিক ইবনে কাছিরের মতে আয়েশা (রা.) তার বড় বোন আসমার (৫৯৫-৬৯২ খ্রিষ্টাব্দ) চেয়ে বয়সে ১০ বছরের ছোট ছিলেন। আসমার (রা.) জন্ম ৫৯৫ খ্রিস্টাব্দ হলে মা আয়েশার জন্ম এর ১০ বছর পর ৬০৫ খ্রিস্টাব্দে। এ হিসবে মা খাদিজার ইন্তেকালের (৬১৯) দুই বছর পর রসুলের সাথে মা আয়েশার বিবাহের (৬২১ খ্রি.) সময় বয়স ছিল ১৬/১৭ বছর এবং এর ৩ বছর পর মদিনায় রসুলের সাথে রুসমত বা পারিবারিক জীবন শুরু (৬২৩ খ্রি.) হয় ১৮/১৯ বছর বয়সে। সুতরাং আমরা দেখতে পেলাম বিয়ে একটি মজবুত চুক্তি। আর এই চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হলে একজনকে প্রাপ্তবয়স্ক হতে হবে, তার জ্ঞানবুদ্ধির বিকাশ হতে হবে, সম্পদ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। এমন একটি বয়সেই রসুলাল্লাহ (সা.) আম্মা আয়েশাকে (রা.) বিবাহ করবেন, কারণ তিনি কোর’আনের নীতি লংঘন করতেই পারেন না।”
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

এপস্টেইন ফাইলস: দাজ্জালীয় সভ্যতার নগ্ন রূপ
জেফরি এপস্টেইন নামটি এখন আর কেবল একজন ব্যক্তির নয়। বরং এটি আধুনিক বিশ্বের তথাকথিত উন্নত সভ্যতার পচে যাওয়া বিবেকের প্রতিচ্ছবি। একজন সাধারণ গণিত শিক্ষক থেকে ওয়াল স্ট্রিটের ধনকুবের এবং সেখান থেকে ইতিহাসের অন্যতম ঘৃণ্য শিশু পাচারকারী ও যৌন অপরাধী হয়ে ওঠার গল্পটি কেবল এপস্টেইনের একার নয়। এটি এমন এক বিশ্বব্যবস্থার গল্প, যা বাহ্যিক চাকচিক্য আর প্রযুক্তির মোড়কে নিজের আত্মাহীন কদর্য রূপটি এতদিন ঢেকে রেখেছিল। সম্প্রতি উন্মোচিত এপস্টেইন ফাইলস সেই মুখোশটিই নির্মমভাবে টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে।
২০২৬ সালে এসে মার্কিন আদালতের নির্দেশে যখন হাজার হাজার পৃষ্ঠার নথি প্রকাশ হতে শুরু করল, তখন বিশ্ববাসী শিউরে উঠল। অভিযোগের তীর যাদের দিকে তারা কেউ রাস্তার সাধারণ অপরাধী নন। তারা বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়ক, অভিজাত রাজপরিবারের সদস্য, বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী এবং বিনোদন জগতের মহাতারকা। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন থেকে শুরু করে ব্রিটিশ রাজপরিবারের প্রিন্স অ্যান্ড্রু, কার নাম নেই সেই তালিকায়? ভার্জিন আইল্যান্ডসের ‘লিটল সেন্ট জেমস’ দ্বীপটি যেন হয়ে উঠেছিল এই ধনাঢ্য ও ক্ষমতাধরদের পাপের অভয়ারণ্য। অথচ এই মানুষগুলোই বিশ্বকে গণতন্ত্র, মানবাধিকার আর নারী স্বাধীনতার ছবক দিয়ে বেড়ান।
প্রশ্ন জাগে, কীভাবে একজন স্কুলশিক্ষক এমন এক বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন? উত্তরটি লুকিয়ে আছে আমাদের বর্তমান সমাজব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। এই সভ্যতা মানুষকে শিখিয়েছে অর্থই সব। যেখানে অর্থ এবং ক্ষমতা আছে, সেখানে নীতি-নৈতিকতা তুচ্ছ। এপস্টেইন তার বিপুল অর্থ দিয়ে আইন, বিচারব্যবস্থা এবং প্রশাসনকে নিজের পকেটে পুরে রেখেছিলেন। ২০০৮ সালে যখন তিনি প্রথমবার ধরা পড়েন, তখন তাকে নামমাত্র শাস্তি দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। একে বলা হয়েছিল ‘শতাব্দীর সেরা সমঝোতা’। এটি কি প্রমাণ করে না যে, মানবরচিত এই বিচারব্যবস্থা আসলে মাকড়সার জালের মতো যেখানে ছোটরা আটকা পড়ে, আর বড়রা জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যায়?
এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা যে পশ্চিমা সভ্যতাকে অন্ধের মতো অনুকরণ করছি, তার ভিত্তি কতটা নড়বড়ে। এটি এমন এক ভোগবাদী সভ্যতা, যা মানুষকে তার স্রষ্টার দেওয়া পবিত্র সত্তা থেকে বিচ্যুত করে কেবল প্রবৃত্তি বা ‘নফস’ এর গোলামে পরিণত করেছে। যখন কোনো সমাজে আল্লাহর ভয় বা পরকালীন জবাবদিহিতা থাকে না, তখন মানুষ পশুত্বেরও নিচে নেমে যায়। তখন তাদের কাছে নারী বা শিশু কেবল ভোগের সামগ্রী হয়ে দাঁড়ায়। এপস্টেইন এবং তার হাই-প্রোফাইল বন্ধুরা সেই সত্যটিই প্রমাণ করেছেন। তারা শিক্ষায়, প্রযুক্তিতে বা ক্ষমতায় শীর্ষে থাকতে পারেন, কিন্তু মানবিকতা ও আত্মিক পবিত্রতায় তারা দেউলিয়া।
আজকের এই যান্ত্রিক সভ্যতা মানুষকে দেহসর্বস্ব প্রাণীতে রূপান্তর করেছে। এখানে সুখ মানেই ইন্দ্রিয়তৃপ্তি। এই দর্শনের ফলেই তৈরি হয় এপস্টেইনের মতো পিশাচরা এবং গিসলাইন ম্যাক্সওয়েলের মতো সহযোগীরা, যারা শিশু ও কিশোরী মেয়েদের পণ্য হিসেবে ব্যবহার করতে দ্বিধা করে না। ট্রাম্প বা ক্লিনটনের মতো বিশ্বনেতাদের নাম যখন এমন নোংরা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে যায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে, এই ‘সিস্টেম’ বা ব্যবস্থাটি আগাগোড়াই পচা। এরা মুখে মানবতার বুলি আওড়ালেও গোপনে শয়তানের উপাসনাই করে চলেছে। এদের হাতে মানবতার মুক্তি তো দূরের কথা, নিরাপত্তা পর্যন্ত নেই।
তাহলে মুক্তির পথ কী? মুক্তির পথ কোনো নতুন আইন প্রণয়ন বা নেতা পরিবর্তনে নেই। মুক্তির একমাত্র পথ হলো মানুষের হারিয়ে যাওয়া নৈতিক সত্তার পুনরুত্থান। স্রষ্টার দেওয়া শাশ্বত সত্য ও তওহীদের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ফলেই আজ মানবজাতি এই অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিপতিত হয়েছে। প্রকৃত সত্য বা হক মানুষকে শেখায় জীবনের উদ্দেশ্য কেবল ভোগ-বিলাস নয়, বরং ন্যায় ও সত্যের প্রতিষ্ঠা। এক স্রষ্টার প্রতি অবিচল বিশ্বাস এবং তার দেওয়া জীবনব্যবস্থাই কেবল মানুষকে প্রবৃত্তি বা নফসের দাসত্ব থেকে মুক্তি দিতে পারে।
যে সমাজে স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব নেই, আছে কেবল মানুষের মনগড়া আইন আর অর্থের দাপট, সেখানে হাজারটা আইন করেও এপস্টেইনদের থামানো যাবে না। আজ প্রয়োজন এমন এক আমূল পরিবর্তনের, যেখানে মানুষ মানুষকে বিচার করবে না অর্থের মানদণ্ডে, বরং বিচার করবে নৈতিকতার ভিত্তিতে। আমাদের বুঝতে হবে, দালানকোঠা আর প্রযুক্তির নাম সভ্যতা নয়; প্রকৃত সভ্যতা হলো সেটি, যা মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করতে শেখায় এবং পশুপ্রবৃত্তি থেকে রক্ষা করে।
‘এপস্টেইন ফাইল’ হয়তো আইনি প্রক্রিয়ায় একদিন ধামাচাপা পড়ে যাবে, কিংবা নতুন কোনো কেলেঙ্কারিতে মানুষ এটি ভুলে যাবে। কিন্তু ইতিহাসের পাতায় এটি একটি দগদগে ঘা হয়ে থাকবে। এটি আমাদের সতর্কবার্তা দিচ্ছে- সময় এসেছে ফিরে আসার। ভোগবাদ আর বস্তুবাদী এই মরীচিকার পেছনে না ছুটে, আমাদের আঁকড়ে ধরতে হবে সেই শাশ্বত সত্যের রজ্জু, যা মানুষকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসে। নতুবা এই চাকচিক্যময় সভ্যতার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েই আমাদের বিনাশ ঘটবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট



















