ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, কোনো বিশ্বযুদ্ধই একদিনে বা একটিমাত্র কারণে শুরু হয়নি। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট আঞ্চলিক সংঘাত, পরাশক্তিগুলোর আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং জোটবদ্ধ স্বার্থের দ্বন্দ্ব একসময় পুরো বিশ্বকে গ্রাস করেছিল। ২০২৬ সালের পৃথিবীতে চোখ রাখলে ঠিক সেই একই চিত্র ফুটে ওঠে। ইউরোপ থেকে মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া থেকে আফ্রিকা গোটা বিশ্ব যেন আজ আক্ষরিক অর্থেই একটি বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। সংঘাতের এই বৈশ্বিক চেইন রিঅ্যাকশন দেখে বিশ্লেষকদের মনে আজ একটাই প্রশ্ন: পৃথিবী কি তবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে?
বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতার প্রথম বড় স্ফুলিঙ্গটি জ্বলেছিল ২০২২ সালে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। চার বছর পেরিয়ে গেলেও এই যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই; বরং এটি এখন পরাশক্তিগুলোর মর্যাদার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। ন্যাটো ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা ইউক্রেনকে টিকিয়ে রাখলেও, রাশিয়া তার অবস্থান থেকে এক চুলও সরেনি। উল্টো এই যুদ্ধ বিশ্বকে স্পষ্টভাবে দুটি মেরুতে ভাগ করে দিয়েছে। এই সংঘাতের জেরে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের যে প্রচ্ছন্ন হুমকি বিশ্ববাসী দেখেছে, তা স্নায়ুযুদ্ধের পর আর কখনো দেখা যায়নি।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতেই মধ্যপ্রাচ্য পরিণত হয়েছে নতুন এবং সবচেয়ে ভয়ংকর রণাঙ্গনে। কয়েক দশক ধরে চলা ‘ছায়াযুদ্ধ’ এখন আর ছায়ায় নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে খোদ ইরানের রাজধানী তেহরানে হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইরানও মার্কিন ও ইসরায়েলি স্বার্থে সরাসরি মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং মানবিক সংকট পুরো আরব বিশ্বকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। লোহিত সাগরে হুথিদের আক্রমণ বৈশ্বিক বাণিজ্যের টুঁটি চেপে ধরেছে। এই বহুমুখী সংঘাত এখন আর কেবল ফিলিস্তিন বা ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি আঞ্চলিক মহাযুদ্ধে পরিণত করেছে।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা

ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে এশিয়ার পরিস্থিতিও অত্যন্ত নাজুক। চীন-তাইওয়ান উত্তেজনা: তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার সামরিক উত্তেজনা যেকোনো সময় বড় সংঘাতে রূপ নিতে পারে। দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে নিত্যদিনই মহড়া চলছে।
কোরীয় উপদ্বীপ: উত্তর কোরিয়া ক্রমাগত তাদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক মিসাইলের পরীক্ষা চালিয়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের জন্য বড় হুমকি তৈরি করে রেখেছে।
দক্ষিণ এশিয়া: আফগানিস্তানে তালেবান ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বড় ধরনের সামরিক অভিযান (‘অপারেশন গজব-লিল হক’) এই অঞ্চলে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। পারমাণবিক শক্তিধর দুই দেশ- ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার পুরনো বৈরিতাও এই অঞ্চলের জন্য সবসময়ই একটি সুপ্ত আগ্নেয়গিরি।
বিশ্বের মূলধারার গণমাধ্যমে কম এলেও আফ্রিকার পরিস্থিতিও ভয়াবহ। সুদান, মালি, নাইজার বা বুরকিনা ফাসোর মতো দেশগুলোতে গৃহযুদ্ধ এবং সামরিক অভ্যুত্থান লেগেই আছে। সেখানেও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রভাবের বিপরীতে রাশিয়ার ‘ভ্যাগনার গ্রুপ’ (বর্তমান আফ্রিকা কোর) ও চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্যের নীরব প্রক্সি যুদ্ধ চলছে।
তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেবল অস্ত্র দিয়েই হবে না, হবে অর্থনীতি দিয়েও। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও সারের সাপ্লাই চেইন ভেঙে দিয়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে। এখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে হরমুজ প্রণালী যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশছোঁয়া হবে। এই অর্থনৈতিক ধস বিশ্বের দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ডেকে আনবে।
বর্তমানে বিশ্ব খুব স্পষ্টভাবে দুটি ব্লকে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ন্যাটো ও তাদের পশ্চিমা মিত্ররা; অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, ইরান এবং উত্তর কোরিয়া নিয়ে গঠিত অঘোষিত জোট। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে ইরান যদি কোণঠাসা হয়ে রাশিয়া বা চীনের সরাসরি সামরিক সহায়তা চায়, তবে এই আঞ্চলিক সংঘাত মুহূর্তের মধ্যে একটি বৈশ্বিক যুদ্ধে (Global War) রূপ নেবে।
পোপ ফ্রান্সিস একবার বলেছিলেন, আমরা হয়তো একটি “খণ্ড খণ্ড তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ” (World War III in pieces) পার করছি। ২০২৬ সালে এসে কথাটি মর্মান্তিকভাবে সত্য বলে মনে হচ্ছে। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে প্রবেশ করিনি ঠিকই, কিন্তু আমরা নিশ্চিতভাবেই খাদের একেবারে কিনারায় দাঁড়িয়ে আছি। একটি ভুল বোমাবর্ষণ, একটি ভুল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত বা পরাশক্তিগুলোর অহমিকা পুরো মানবসভ্যতাকে এমন এক যুদ্ধের আগুনে নিক্ষেপ করতে পারে, যেখান থেকে ফেরার কোনো উপায় থাকবে না। বিশ্বনেতারা কি পারবেন ধ্বংসের এই কিনার থেকে পৃথিবীকে ফিরিয়ে আনতে? উত্তরটি তোলা রইল মহাকালের কাছে।।

















