ওবায়দুল হক বাদল:
বুকে হাত দিয়ে বলুন তো আপনার সাথে সুদের কোনো সম্পর্ক নেই, সুদ আপনাকে স্পর্শ করতে পারে না। পারবেন? পারবেন না। বরং যদি একটু চিন্তা করেন তাহলে দেখবেন ধার্মিক-অধার্মিক, আস্তিক-নাস্তিক আমরা সবাই সুদের মধ্যে আপাদমস্তক ডুবে আছি। আপনি চাইলে চুরি না করে থাকতে পারবেন, ব্যভিচার না করে থাকতে পারবেন কিন্তু সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কোনোভাবেই সুদের সাথে সম্পর্ক ছেদ করতে পারবেন না। কোনো না কোনোভাবে আপনি সম্পৃক্ত থাকবেনই। অথচ সুদকে আল্লাহ হারাম করেছেন। শুধু তাই নয়, সুদের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন।
যারা সুদ খাওয়া বন্ধ করবে না তাদেরকে আল্লাহ বলেছেন, ‘যেন আল্লাহ ও তাঁর রসুলের সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য তৈরি থাকে।’ (সুরা বাকারা ২৭৯)
রসুল (সা.) বলেছেন- ‘সুদখোরীর গুনাহ ৭০টি পর্যায়ে বিভক্ত, আর এদের মধ্যে সবচেয়ে কম হল নিজের মায়ের সাথে ব্যভিচার করার মতো।’ (সুনান ইবন মাজাহ: ২২৭৪)
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

কেন সুদের সাথে সম্পর্ক ছেদ সম্ভব নয়?
কোর’আনের আল্লাহর বিধান দুই ধরনের। কিছু ব্যক্তিগত আর কিছু সামষ্টিক। যেমন ধরুন মদ। মদ আল্লাহ হারাম করেছেন। এখন আপনি চাইলেই আল্লাহর নির্দেশ ফলো করে মদ খাওয়া ছেড়ে দিতে পারবেন। এটা ব্যক্তিগত বিধান। ব্যক্তিগত বলেই আপনি প্রতিজ্ঞা করতে পারবেন আপনি জীবনেও মদ ছোঁবেন না, এই হারাম কাজ থেকে আপনি বিরত থাকবেন এবং আপনার সংকল্প দৃঢ় হলে আপনি পারবেনও।
কিন্তু সমষ্টিগত বিধানগুলো, বিধি-নিষেধগুলো আপনি চাইলেও একা একা পালনও করতে পারবেন না আর এর থেকে নিজেকে মুক্তও রাখতে পারবেন না। তেমনি একটি বিষয় হলো সুদ। আপনি মদ ছাড়তে পারবেন কিন্তু সুদ ছাড়তে পারবেন না আপনি ছাড়তে চাইলেও সুদ আপনাকে ছাড়বে না।
রাষ্ট্রের অর্থনীতিই যেহেতু সুদভিত্তিক, কাজেই আপনি আমি সবাই সুদের মধ্যে ডুবে আছি, আপাদমস্তক ডুবে আছি। আপনি নিজে হয়ত সুদে টাকা লাগান না কিংবা সুদে টাকা ঋণও করেন না। ব্যাঙ্কের সাথেও হয়ত আপনার কোনো লেনদেন নেই। তথাপিও আপনার আমার পকেটের প্রত্যেকটা টাকা সুদের সাথে সম্পৃক্ত।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়ে বাংলাদেশ সরকার ও অন্যান্য প্রাইভেট ব্যাংকগুলোকে সুদে ঋণ দেয়। প্রাইভেট ব্যাংক আবার যে বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের ঋণ দেয় তাও সুদে। তার মানে সুদভিত্তিক অর্থনীতিতে সুদ ছাড়া কোনো মানি ক্রিয়েট হয় না। ১ টাকা থেকে শুরু করে ১০০০ টাকার প্রত্যেকটা নোট সুদের সাথে সম্পর্কিত। ১ টাকার একটা নোট ছাপা হলে সেটাও সুদের মাধ্যমেই হাতবদল হয়। এবং প্রতিবার হাত বদলে তাকে দিয়ে সুদের ব্যবসা করছে কেউ না কেউ। কেউ সুদ নিচ্ছে আর কেউ দিচ্ছে। এভাবে হাতবদল হতে হতেই আপনার আমার হাতে আসে।
বিশ্ব ব্যাঙ্ক, আইএমএফের ঋণ ছাড়া আমাদের বাজেট হয় না। তারা আমাদের সুদ ছাড়া ঋণ দেয়? হয়ত করুণা করে সুদের হারটা একটু কমিয়ে দেয় অনেকসময়। আর সেই ঋণ সরকার শোধ করে আপনার আমার ভ্যাট-ট্যাক্সের টাকা দিয়ে। পারবেন ভ্যাট-ট্যাক্স না দিয়ে থাকতে? অথবা সরকারকে বলতে পারবেন আমার ট্যাক্স থেকে যেন ঋণের সুদ পরিশোধ করা না হয়। চলমান পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে কোনো সরকারও কি চাইলেই পারবে? পারবে না। সিস্টেমটাই এভাবে দাঁড়িয়ে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কিংবা বিশ্ব ব্যাংক থেকে সুদে ঋণ নিয়ে সেই টাকা দিয়ে বাংলাদেশ সরকার রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, মসজিদ, মন্দির ইত্যাদি সকল প্রকার কাজ করছে। আমদানি, রপ্তানি, ব্যবসা, বাণিজ্য, সবকিছুর সাথেই এই সুদ মিশে আছে। তার মানে আপনি যে রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন সেই রাস্তার ইটের কণাটার সাথে সুদ জড়িত। আপনার হাতের মোবাইল ফোনটার সাথেও। দোকানে যে এক কাপ চা খাচ্ছেন, বাচ্চার দুধ কিনছেন, মায়ের ঔষধ কিনছেন, ফ্রিজ, টিভি কিনছেন সেইসব কোম্পানিগুলো সুদের টাকায় বাণিজ্য করছে। আপনি সুদনির্ভর ব্যবসায়ীদের পণ্য ক্রয় করে তাদের লাভবান করছেন। তারা আপনার আমার মতো ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করে লাভ করে তাদের সুদে নেওয়া ঋণ শোধ করছে। ব্যবসা বড় করতে সুদে আরো মোটা অঙ্কের ঋণ করছে।
বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ৬ হাজার ৯৯৯ টাকা। আজকে যে শিশুটি জন্ম নিলো সেও মাথার উপর এই বিপুল পরিমাণ ঋণের বোঝা নিয়ে জন্ম নিলো। প্রতিদিন এই নবজাতকের ঋণও বাড়ছে সুদও বাড়ছে। সেও এই অভিশাপ থেকে রেহাই পাবে না। এই সমাজে যদি বসবাস করতে হয় তাহলে এই শিশুটিকেও দেশের এই সুদের ঘানি সারাজীবন টানতে হবে। অর্থাৎ ভূমিষ্ঠ হবার সাথে সাথে সে ঋণ আর সুদের জালে আটকে গেল।
সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় কোনো একজন ব্যক্তিরও নিজেকে সুদি কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা সম্ভব না। পরোক্ষভাবে হলেও প্রত্যেককে সুদের সাথে জড়াতে হবেই। আপনি আমি সুদের উপর না পড়লেও সুদ এসে আমাদের উপরে পড়বে, পড়বেই। যদি এই সমাজ ছেড়ে কোনো গুহায় গিয়ে বসবাস করেন, কোনো নির্জন দ্বীপে গিয়ে বসবাস করেন এবং এই সমাজের সাথে সকল প্রকার আর্থিক লেনদেন, সম্পর্ক, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রাখেন তাহলে ভিন্ন কথা।
রসুলাল্লাহ (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন- লোকেদের মধ্যে এমন যুগ আসবে যখন একজন মানুষও সুদের ব্যবহার থেকে মুক্ত হতে পারবে না। সে প্রত্যক্ষভাবে সুদ না খেলেও সুদের ধোঁয়া বা ধূলা হলেও তাকে স্পর্শ করবে। (আহমাদ, আবু দাউদ, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ)
এই যুগই রসুলাল্লাহ (সা.) বর্ণিত সেই যুগ। সুদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জালে আটকে গেছি। এখান থেকে বের হতে পারতেছি না। বের হবার পথও জানি না, জানলেও পরিবর্তনের রাস্তা চিনি না অথবা সাহস করি না। অনেকে হতাশ হয়ে হাত-পা ছেড়ে দিয়ে মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। অনেকে অভ্যস্ত হয়ে গেছে।
এখন কথা হচ্ছে- আমরা সকল সুদি কার্যক্রমের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাই কি না। যদি চাই তাহলে সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থা বাদ দিয়ে সুদবিহীন অর্থব্যবস্থা রাষ্ট্রে কায়েম করতে হবে। তবেই কেবল আপনি সুদ থেকে রেহাই পাবেন। আর সুদবিহীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দিতে পারে একমাত্র ইসলাম। ইসলামী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যদি রাষ্ট্রে কায়েম করা যায় তাহলেই কেবল পুরো জাতি সুদের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারবে।
এজন্য দরকার একটি সিদ্ধান্ত। বিশ্বময় চলমান মানবরচিত জীবনব্যবস্থা পরিত্যাগ করে আল্লাহর দেওয়া দীন জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার বিপ্লবী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রতিষ্ঠা করতে হবে আল্লাহর দেওয়া অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। সে পর্যন্ত আমরা সবাই সুদি আমাদের এই সুদের রাজত্বে।



















