মো. হারিছুর রহমান:
সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে মাত্র একটি ভূমিকে আল্লাহ বরকতময় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর তা হচ্ছে বর্তমানের বৃহত্তর ফিলিস্তিন। যেখানে তিনি হযরত ইবরাহিম (আ.) ও ভ্রাতষ্পুত্র হযরত লুত (আ.) কে প্রাচীন ইরাকের ব্যবিলন থেকে উদ্ধার করে হিজরত করিয়েছিলেন (সুরা আস্বিয়া: ৭১)। সেই থেকে ইবরাহিম (আ.) এর বংশধর হিসেবে ইহুদিরা এ ভূমিতে বসবাসের অধিকার লাভ করে। কিন্তু তাদের এ অধিকারপ্রাপ্তি নিঃশর্ত ছিল না। বরং মহান আল্লাহ তাদেরকে ‘সালেহ’ বা সৎকর্মশীল বান্দা হওয়ার শর্তে, অর্থাৎ ঈমান ও সৎকর্মের শর্ত পূরণ হলে (সুরা আম্বিয়া: ১০৫), সে বরকতময় ভূমিতে থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। শর্ত যদি ভঙ্গ হয় তবে তারা অবশ্যই সে পূণ্যভূমিতে বসবাসের অধিকার হারাবে এবং শাস্তিপ্রাপ্ত হয়ে সেখান থেকে বিতাড়িত হবে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় তারা সে কথা ভুলে যায়। এরই ধারাবাহিকতায় কায়েমী স্বার্থ হাসিলের জন্য মহান আল্লাহর দেয়া এ শর্তকে ভঙ্গ করে তৌরাত বিকৃত করে সেখানে নিজেদের পছন্দমত বাক্য প্রতিস্থাপন করার ধৃষ্টতা দেখায় (তৌরাত ২য় বিবরণ ৯:৬)। কিন্তু মহান আল্লাহর বিধান অলঙ্ঘণীয়।
পবিত্র কোর’আন থেকে আমরা জানতে পারি যে, ইহুদিরা ইতোপূর্বে দুইবার ঐ ভূমিতে ফ্যাসাদ- অন্যায়, অবিচার ও অত্যাচারে লিপ্ত হয়েছিল এবং দুইবারাই কঠিন শাস্তিপ্রাপ্ত হয়ে সেখান থেকে বিতাড়িত হয় (সুরা বনী-ইসরাইল: ৪)। প্রথমবার নির্ধারিত শাস্তিটি আসে ৫৮৭-৫৮৬ অব্দে। তৎকালীন ব্যাবিলনীয় সম্রাট বখত নসর বা দ্বিতীয় নেবুচাদনেজার ইসরায়েলিদের আয়ত্বে থাকা জেরুজালেম অবরোধ করে এ শহরের উপর ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। লাইব্রেরি ও পুস্তকসমূহ পুড়িয়ে দেয়, ঘরবাড়িতে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়া হয়, আধিবাসীদের নির্বিচারে হত্যা করা হয় এবং হযরত সোলায়মান (আ.) এর নির্মিত মসজিদটিও ধ্বংস করে দেয়া হয়। পরবর্তীতে যুদ্ধ শেষে বহু ইহুদিদের দাস হিসেবে বন্দী করে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের এ বন্দিত্ব ও অপমানের অন্যতম কারণ ছিল আল্লাহ প্রেরিত পবিত্র গ্রন্থ তৌরাতকে বিকৃত করে হারাম ও হালালের মিশ্রণ ঘটানো। যেমন, সুদ সকলের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু তারা কিতাবের আয়াতকে পরিবর্তন করে নিজেদেরকে বাদ দিয়ে অন্যান্যদের সাথে সুদের লেনদেনকে জায়েজ বলে ঘোষণা দেয়। পরবর্তীতে এ নিদারণ কষ্টের দিনগুলোর এক পর্যায়ে গিয়ে মহান আল্লাহ তাদের অনুশোচনা ও ক্রন্দণরত অবস্থা দেখে দয়াপরবেশ হয়ে তাদেরকে ক্ষমা করেন এবং পুনরায় তাদেরকে উদ্ধারের জন্য নবী প্রেরণ করলেন। অতঃপর প্রাচীন পারস্য সম্রাটের সহায়তায় তারা পুনরায় তাদের ভূমি জেরুজালেমে ফিরে আসে।
কালক্রমে ইহুদি জাতি আবারও ঈমান ও সৎকর্মশীলতাকে ভুলে গিয়ে পুনরায় কুফরির দিকে অগ্রসর হয়। এমনকি নিজেদের কায়েমী স্বার্থ বজায় রাখার জন্য তারা তাদের মধ্যে প্রেরিত নবীদের হত্যা করতেও কুণ্ঠিত বোধ করেনি। বহু নবীকে এ ইহুদি জাতি হত্যা করে যার মধ্যে সর্বশেষ ছিলেন হযরত জাকারিয়া (আ.) ও হযরত ইয়াছিন (আ.)। সর্বশেষ ঈসা (আ.) কে হত্যাচেষ্টা চালালে মহান আল্লাহ তাঁকে উদ্ধার করেন এবং তাদের জন্য পুনরায় শাস্তি নির্ধারণ করেন। ৭ম খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাটের সেনাপতি টাইটাস তাদের উপর লানত হয়ে খড়গহস্ত হয়। রোমান বাহিনী জেরুজালেমে প্রবেশ করে পুননির্মিাণ চলকালীন সোলায়মান (আ.) এর মসজিদ ধূলিসাৎ করে, ইহুদিদের নির্বিচারে হত্যা করে এবং তাদেরকে পুনরায় জেরুজালেম থেকে বের করে দেয়। এবার তারা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। তাদের আর একত্রে থাকা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ছড়িয়ে ছিটিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে চলে গেলেও আল্লাহর লা’নত তাদের পিছু ছাড়ে না। এর অন্যতম কারণ ছিল এত শাস্তির পরেও তাদের স্বভাবে কোনো পরিবর্তন আসেনি। তাই তারা যে দেশেই গিয়েছে সে দেশেই নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তাদের উপর ঘটিত এ নির্যাতনকে সংজ্ঞায়িত করার জন্য অভিধানে একটি নতুন শব্দ সংযোজন করা হয়। Pogrom, যার আভিধানিক অর্থ হলো- Organised killing and plunder of a community of people- বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, সুসংগঠিতভাবে সম্প্রদায়বিশেষকে হত্যা ও লুন্ঠণ। যুগের পর যুগ এ ঘটনাটি ঘটেছে। এক জার্মানিতেই হিটলারের হাতে প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদি নিহত হয়। অবশেষে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশদের সহায়তায় ১৯৪৮ সালে তারা পুনরায় ফিলিস্তিনে ফেরার সুযোগ পায়।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

এ ফিরে আসার বিষয়টিও নির্ধারিত। মহান আল্লাহ পবিত্র কোর’আনে বলেন, প্রতিশ্রুত সময় যখন আসবে আমি তোমাদের একত্রিত করব মিশ্রজাতি হিসেবে (সুরা বনি ইসরাইল: ১০৪)।” ভাবলেই অবাক হতে হয় যে, আল্লাহর শব্দ চয়ন কতটা নিখুঁত। আয়াতে ব্যবহৃত আরবি ‘লাফিফা’ শব্দটি ‘বিভিন্নতা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। আজকের ইহুদিদের মধ্যে তাকালে শব্দটির মর্মতা স্পষ্ট হয়ে যায়। ইহুদিরা মূলত সেমিটিক জাতিভুক্ত ছিল। কিন্তু পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর সংস্পর্শে থাকার কারণে তাদের মধ্যে বিভিন্নতা সৃষ্টি হয়। তারা জেনেটিক্যাল- বংশগত বিশুদ্ধতা হারায়। আজ তাদের দৈহিক গঠন ও রঙে পরিবর্তন স্পষ্ট। তদুপরি তাদের মধ্যে যুক্ত হয়েছে নতুন দুই ভাগ, সেফার্দিক ইহুদি ও আশকেনাযিস ইহুদি। মূলত তাদের আগত স্থানের উপর ভিত্তি করেই এ ভাগ করা হয়েছে। স্পেন ও পর্তুগালের ইহুদিদের বলা হয় সেফার্দিক ইহুদি এবং পূর্ব ইউরোপের ইহুদিদের বলা হয় আশকেনাযিস ইহুদি। ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্ম ছিল মূলত; গোত্রীয় ধর্ম। কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে ইউরোপিয়রা এ দুটি ধর্ম গ্রহণ করে নেয় যা এখনও পণ্ডিতদের গবেষণার বিষয়।
মিশ্রজাতি হিসেবে ইহুদিরা কাদের ছত্রছায়ার ফিলিস্তিনে ফিরবে তাও কোর’আন বলে দেয়। আল্লাহ বলছেন, “যে সব জনপদকে আমি ধ্বংস করেছি তার অধিবাসীদের ফিরে না আসা অবধারিত, যে পর্যন্ত না ইয়াজুজ ও মাজুজকে বন্ধনমুক্ত করে দেয়া হবে এবং তারা প্রত্যেক উঁচু ভূমি থেকে দ্রুত ছুঁটে আসবে (সুরা আস্বিয়া: ৯৫-৯৬)।” এ আয়াত থেকেই বোঝা যাচ্ছে আজ পশ্চিমা দাজ্জালিয় শক্তি ইয়াজুজ-মাজুজ হয়ে আধিপত্য বিস্তারের জন্য পৃথিবীর অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোতে আক্রমণ চালাচ্ছে। সচেতন পাঠকমাত্রই বুঝতে পারবেন যে বর্তমান সময়ের কথাই উক্ত আয়াতে উপস্থাপন করা হয়েছে কারণ ইহুদিদের পুনর্বাসনে অন্যতম ভূমিকা নিয়েছিল বতর্মানে পশ্চিমা দাজ্জালিয় সভ্যতা।
তবে আমার প্রশ্ন হলো, আজকের ইহুদিরা কী স্থায়িভাবে ফিলিস্তিনে বসবাস করতে পারবে? পবিত্র কোর’আন কিন্তু এর উত্তর দিয়েছে। পবিত্র কোর’আনে মহান আল্লাহ বলেন, “যদি তোমরা পূর্ব আচরণে ফিরে যাও তবে আমিও ফিরে আসব শাস্তি নিয়ে (সূরা বনি ইসরাইল: ৮)।” বোঝাই যাচ্ছে তাদের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তাদেরকে সুযোগ দেয়ার পরও তারা সংযম ধারণ করেনি এবং পৃথিবীতে ফাসাদ ও সাফাকুদ্দিমা করেছে, যার বাস্তব চিত্র এখন বিশ্ববাসী দেখছে। তারা যদি এগুলো বাদ দিয়ে ঈমান আনত ও আমলে সালেহ (সৎকর্ম) করত তবে আল্লাহ তাদেরকে উচ্চতর মাকামে পৌঁছে দিতেন। কিন্তু তারা পূর্ববত গাফেল হয়ে কুফরির পথকে বেছে নিয়েছে। আর এবার তার শাস্তি হবে চরম ভয়াবহ।
অতএব, আল্লাহর দেয়া শর্ত ভঙ্গ করার কারণে তারা খুব শীঘ্রই তৃতীয় ও চূড়ান্তবারের মত ফিলিস্তিন থেকে বিতাড়িত হবে। বর্তমানের ইরান-ইসরাইল যুদ্ধ সে পথেরই সূচনা কিনা তা ভেবে দেখার বিষয়। পুনশ্চঃ ইরান ইতোমধ্যেই ইহুদিদেরকে ফিলিস্তিন ছাড়ার জন্য হুমকি দিয়েছে। তাই এখন দেখতে হবে কী ঘটে। তবে ভবিষ্যতে যে তাদের জন্য চরম দুর্দশা অপেক্ষা করছে সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। [লেখক: ইসলামি গবেষক ও সাবেক কর্মকর্তা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ]



















