রিয়াদুল হাসান:
কাবা আল্লাহর ঘর, পবিত্র বাইতুল্লাহ শরিফ। আমরা এই গৃহকে ভক্তি করি, প্রাণের অধিক ভালোবাসি। সকল মুসলিম জীবনে একবার হলেও কাবা দর্শনের স্বপ্ন দেখি। আমরা কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে নামাজ পড়ি, কাবাকে কেন্দ্র করে হজ করি। প্রশ্ন হলো, এই কাবাকেন্দ্রিকতার মূল উদ্দেশ্য কী? ইসলামবিদ্বেষীরাও কাবা নিয়ে নানা অপপ্রচার করে যে, মুসলিমরা মূর্তিপূজার বিরোধিতা করে অথচ নিজেরাই পৌত্তলিকদের মতোই একটি জড়বস্তুর (কাবা) সামনে সেজদা করে।
কাবা ঘরকে আল্লাহ মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক হিসেবে স্থাপন করেছেন। এই ঐক্য হচ্ছে লক্ষ্যের ঐক্য। আজকে তো ২২০ কোটি মুসলিম ভৌগোলিকভাবে ৫৭ টি দেশে বিভক্ত, রাজনৈতিক ধর্মীয় ফেরকা মাজহাব তরিকাগত বিভক্তির কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু আজ থেকে ১৪শ বছর আগে যখন এই উম্মাহর সৃষ্টি হয়, তখন এই বিভক্তিগুলো ছিল না। তখন তারা ছিল এক জাতি, তাদের লক্ষ্য ছিল এক, তাদের নেতা ছিলেন একজন। তাদের লক্ষ্য ছিল, যুদ্ধ করে সমগ্র পৃথিবীতে বিরাজিত অন্যায় অবিচার নির্মূল করে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শান্তি ন্যায় সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। এই দীনের আদর্শিক সিদ্ধান্ত হচ্ছে, আল্লাহ যেমন একজন, রসুল (সা.) যেমন একজন, কেতাব যেমন একটি, দীন যেমন একটি, কাবা যেমন একটি, তেমনি জাতিও হবে একটি, দেশও হবে একটি। কোনো প্রকার বিভাজন চলবে না। আর জাতির নেতাও হবেন কেবল একজন। এজন্য সালাতের সময় ইমাম থাকেন একজন, পিছনে মুসল্লি যত ইচ্ছা থাকতে পারে।
আমরা সবাই এক লক্ষ্যকে ধারণ করি। আমাদের সবার অভিমুখ এক, গন্তব্য এক, পথও এক। আমি একনিষ্ঠ হয়ে সেই সত্তার দিকেই আমার মুখ ফিরিয়েছি, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন; আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই (সুরা আনআম ৬৯)। আমি কোনো রাজনৈতিক মতবাদের অনুসারী নই, আমি গণতান্ত্রিক নই, সাম্যবাদী নই; আমি কোনো ভৌগোলিক জাতীয়তাবাদের ধারক নই, আমি বাংলাদেশী বা পাকিস্তানি নই। আমি কোনো মাজহাব বা উপদলের অনুসারী নই, আমি হানাফি নই, আমি হাম্বলিও নই। আমি কেবল আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করি; আমি কেবল মুসলিম। আমার সালাত, আমার কোরবানি, আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু- সবই আল্লাহর জন্য (সুরা আনআম ১৬২)।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

আবার আল্লাহ মুসলিমদের বার্ষিক জাতীয় সম্মেলন হিসাবে হজের বিধান দিয়েছেন। হজের স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছেন সেই কাবার প্রাঙ্গণ, যদিও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতাগুলো আশপাশের সাফা-মারওয়া, মিনা, আরাফাত এবং মুজদালিফায় পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা হয়।
আল্লাহর বিধানমতে হজের নেতৃত্ব দেবেন জাতির ইমাম অর্থাৎ কেন্দ্রীয় নেতৃত্বদানকারী ব্যক্তি। তিনি সেখানে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন- যেমন মহানবী (সা.) বিদায় হজের সময় ভাষণ দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীকালে খলিফারাও সেই সুন্নাতের অনুসরণ করেছেন। আল্লাহর অভিপ্রায় হচ্ছে, বছরে একবার সারা বিশ্বের নেতৃস্থানীয় মুসলিমরা হজের ময়দানে সমবেত হবেন। সেখানে মুসলিম বিশ্বের খলিফা বা ইমামের সঙ্গে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক, সামরিকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হবে, পরামর্শ হবে, পরিকল্পনা হবে এবং সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে। এরপর খলিফা তাঁর হজের খুতবার মাধ্যমে মুসলমানদেরকে দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন। এভাবেই হজ হয়ে উঠবে জীবন্ত ও প্রাণবন্ত- মুসলিম উম্মাহর জাগতিক সংকটের সমাধানস্থল।
বর্তমানে জাতিসংঘের সম্মেলনে কী ঘটে? সারা বিশ্বের শাসকরা সেখানে সমবেত হয়ে বৈশ্বিক সংকট নিয়ে আলোচনা করেন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। ইসলামও সারা বিশ্বের জন্য এসেছে। তাই সারা বিশ্বের মুসলিমরা যাতে বছরে একবার একত্রিত হয়ে আলোচনা-পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেই উদ্দেশ্যেই আল্লাহ হজের বিধান দিয়েছেন।
তবে হজ শুধু একটি সম্মেলনমাত্র নয়। এর প্রতিটি রীতি-নীতি ও আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই আল্লাহ মুসলিম উম্মাহর জন্য জাগতিক ও আধ্যাত্মিকতার চমৎকার এক প্রশিক্ষণ রেখেছেন। আমরা সবাই জানি, হজের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো তাওয়াফ- অর্থাৎ কাবা ঘরকে কেন্দ্র করে সাতবার প্রদক্ষিণ করা। এই কাবাকে তাওয়াফ করার অর্থ কী?
কাবাঘর মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের প্রতীক। সারা বিশ্ব থেকে আগত মুসলিম প্রতিনিধিরা যখন কাবাকে কেন্দ্র করে তাওয়াফ করেন, তখন এর মাধ্যমে মুসলিমদের মনে-মগজে, চিন্তা ও চেতনায় গেঁথে দেওয়া হয়- তোমরা যেখানেই থাকো, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকো না কেন, তোমরা এক উম্মাহ। তোমাদের কেবলা এক, লক্ষ্য এক, উদ্দেশ্য এক- সমগ্র পৃথিবীতে আল্লাহর হুকুম-বিধান প্রতিষ্ঠা করে সমগ্র মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করা। সমগ্র মানবজাতি একজাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হবে, পৃথিবী হবে এক দেশ, এবং আল্লাহ প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা অনুসরণ করে মানবজাতি ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি লাভ করবে।
সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য তোমাদের নিরন্তর ছুটে চলতে হবে। থেমে যাওয়া যাবে না, স্থবির হয়ে পড়া যাবে না এবং এই লক্ষ্যকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো লক্ষ্য স্থির করা যাবে না। সৌরজগতের গ্রহগুলো যেমন সূর্যকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, তেমনি আমাদের জীবনও আবর্তিত হবে লা-শারীক আল্লাহকে কেন্দ্র করে। এজন্যই তখন হাজিরা উচ্চৈঃস্বরে তালবিয়াহ পাঠ করেন, ‘লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক’- হে আল্লাহ! আমি হাজির; আপনার কোনো শরিক নেই।
আজ আমরা কাবাকে শুধু নামাজের কেবলা হিসেবে নিয়েছি এবং কাবাকেন্দ্রিক হজের আনুষ্ঠানিকতা পালন করছি। কিন্তু আমরা ভুলে গেছি যে কাবা প্রকৃতপক্ষে আমাদের ঐক্যের প্রতীক। আমাদের জাতীয় সমস্যার সমাধান, মানবাধিকার আদায়, সাহায্য-সহযোগিতা, নিরাপত্তা সংকটের সমাধান, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বা সীমান্তের বিরোধ সমাধান, কূটনৈতিক চুক্তি সম্পাদনের জন্য আমরা ছুটে যাই জাতিসংঘ, দিল্লি, বেইজিং, মস্কো, ওয়াশিংটন, লন্ডনের দরবারে। অথচ আমাদের যাওয়ার কথা ছিল কাবা প্রাঙ্গণে। এভাবেই আমাদের কেবলা কার্যত পরিবর্তিত হয়ে গেছে। কাবা ঘর তার আগের অবস্থানেই আছে, কিন্তু আমরা এখন মুখ ফিরিয়েছি পশ্চিমা প্রভুদের দিকে।
আজ আমরা যদি কাবার প্রকৃত উদ্দেশ্য উপলব্ধি করতে পারি যে এটি আমাদের জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, তাহলেই আমাদের পক্ষে সম্ভব হবে ভৌগোলিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ফেরকা-মাজহাবের বিভেদের প্রাচীর ডিঙিয়ে আবার এক আল্লাহর হুকুমের দিকে ‘হানিফ’ বা একনিষ্ঠ হওয়া, জাতিগতভাবে কাবার দিকে ‘মুতাওয়াজ্জুহ’ (অভিমুখী) হওয়া।
[লেখক: রিয়াদুল হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট; ফোন/হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৬৭০১৭৪৬৪৩, ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৬১৭-৩২৯৩৯২]



















