ইমন হাসান দুর্জয়:
বতর্মান বিশ্বে এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। একদিকে যেমন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জয়জয়কার, ঠিক অন্যদিকে মানবিকতা ও মানবতা ভূলুণ্ঠিত। গোটা মানবজাতি আজ শান্তি ও নিরাপত্তার অভাবে ত্রাহি সুরে চেচাচ্ছে। আধুনিক বিশ্বের সবথেকে সমাদৃত জীবনব্যবস্থা ‘গণতন্ত্র’ মানবজাতিকে শান্তি, নিরাপত্তা ও সুবিচার তথা মুক্তি দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাহলে কি জীবনব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্র ব্যর্থ? যদি গণতন্ত্র আমাদের তথা মানবজাতিকে শান্তি দিতে ব্যর্থ হয় তবে এর বিকল্প কোন জীবনব্যবস্থা রয়েছে যার মধ্যমে আমরা সত্যিকার অর্থেই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারব? একমাত্র ইসলাম হচ্ছে সে পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা যার মাধ্যমে এ লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। ইতিহাস সাক্ষী, প্রকৃত ইসলামের মাধ্যমে তৎকালীন আরবে যে শান্তি, ন্যায় ও সুচিবার প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তা যে ধূ ধূ বালিকণার মধ্যে সবুজ উদ্যান তৈরি হওয়ার মত- অনাবিল শান্তির এক স্থান। তাই মানবজাতির মুক্তির একমাত্র পথ এখন শুধুমাত্র ইসলাম।
যদি দুটি ব্যবস্থার মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যাবে প্রচলিত গণতন্ত্র আমাদের সবদিক থেকে বঞ্চিত করে এসেছে। যেমন, গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো ‘জনগণের শাসন’ যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে প্রাধান্য দেয়া হয়। এখানে একজন বিজ্ঞ জ্ঞানী ও মূর্খ উভয়য়ে মতামতকে একই পাল্লায় মাপা হয়, যা স্পষ্টতই এক অযৌক্তিক আচরণ। এখানে ন্যায়সংগত কথার থেকে সংখ্যাগরিষ্ঠের কথাকে প্রাধান্য দেয়া হয় বলে এ ব্যবস্থায় ন্যায় প্রতিষ্ঠা বেশ কষ্টসাধ্য। কারণ ন্যায়-অন্যায়ের মাপকাঠি এখানে সংখ্যার আধিপত্য, শাশ্বত কোনো নীতি নয়। যেখানে ইসলামে ন্যায় ও অন্যায়ের মাপকাঠি নির্দিষ্ট। আল্লাহর হুকুমসমূহ, পবিত্র আল কোর’আন, ন্যায় ও নীতির মূল ভিত্তি। তাই গণতন্ত্রের মত এখানে সংখ্যাকে নয়, বরং সত্যিকার অর্থেই শাশ্বত সে সত্ত্বাকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক বলে বিবেচনা করা হয় যিনি একইসাথে ন্যায়বান ও পরম দয়ালু। তাই গণতন্ত্রের তুলনায় ইসলাম অধিক আধুনিক ও যুক্তিযুক্ত।
এছাড়াও প্রচলিত গণতন্ত্রে নৈতিক সংকট এর চিত্র বহুলভাবে দেখা যায়। প্রচলিত গণতন্ত্রে ‘জবাবদিহিতা’ জনগণের উপর ন্যস্ত থাকে। কিন্তু এত বিশাল জনগোষ্ঠী যার প্রায় সবাই নিজেদের পরিবার-পরিজন ও জীবিকা নির্বাহে ব্যস্ত তাদের পক্ষে এ জবাবদিহিতার বিষয়টি খেয়াল রাখা সম্ভব না এবং তা যৌক্তিকও নয়। কিন্তু ইসলামে ‘জবাবদিহিতা’র বিষয়টি স্বয়ং মহান আল্লাহর হাতে। ইসলামী ব্যবস্থায় আমির বা নেতা মহান আল্লাহ কাছে দায়বদ্ধ তাই তিনি চাইলেও অন্যায় করতে পারেন না। পরকালের ভয় ও ইহকালে অপমানিত হওয়ার শঙ্কা তাকে নৈতিকভাবে দৃঢ় রাখে। তিনি একদিকে যেমন অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার তেমনি ন্যায় ও হকের কাছে নতশীর। তাই গণতন্ত্রের তুলনায় প্রকৃত ইসলামের আদর্শ উত্তম নেতা তৈরি করতে পারে ও জবাবদিহিতার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

তাছাড়া গণতন্ত্র নেতা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও শুধু জনগণের মতামতকে প্রাধান্য দেয়। কিন্তু একজন নেতা হওয়ার জন্য যে সকল যোগ্যতা প্রয়োজন সেগুলোকে খুব একটা যাচাই করা হয় না। নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে প্রয়োজন হয় সে এলাকার মানুষের সমর্থন বা স্বাক্ষর। এর ফলে যারা প্রভাবশালী তারাই নেতৃত্বের দিকে এগিয়ে তাকে কিন্তু অন্যদিকে জাতি যোগ্য নেতৃত্বের সুবিধাগুলো থেকে বঞ্চিত হয়। কিন্তু ইসলাম যোগ্য নেতৃত্বকে সমর্থন করেন। জনগণ অবশ্যই তার নেতা নির্বাচনের অধিকার রাখে আর ইসলাম তা পূর্ণ মাত্রায় সমর্থন করে। কিন্তু ইসলাম সবাইকে নেতা হওয়ার সুযোগ দেয় এবং এরই সাথে দায়িত্ব সম্পর্কেও নৈতিক শিক্ষা প্রদান করে। ইসলামের স্বর্ণযুগের ইতিহাসে এ নৈতিকতা উদাহরণের অভাব নেই।
ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর (রা.) এর একটি কথা আমার এ কথার প্রতিধ্বণিস্বরুপ উল্লেখ করছি। তিনি বলেছিলেন, “ ফোরাত নদীন তীরে যদি একটি কুকুরও না খেয়ে মরে তবে আমি ওমর এ জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য।”- এমন কোনো কথা কী আজ পর্যন্ত প্রচলিত ধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতির কোনো নেতা বলতে পেরেছেন? আর তার এ উক্তি শুধুমাত্র বর্তমানে প্রচলিত ধারার গণতান্ত্রিক রাজনীতিক দলগুলোর নেতাদের মত অযৌক্তিক আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়। বরং এটিই ছিল তাঁর শাসনের মূল ভিত্তি। আজকের প্রচলিত ধারার দুর্নীতিগ্রস্থ নেতারা যখন জনগণের থেকে প্রাপ্ত করের টাকায় জনকল্যাণের বদলে বিলাসিতায় মত্ত থাকেন তখন ইসলামের উজ্জ্বল নক্ষত্র তৎকালীন অর্ধেক বিশ্বের খলিফা বা শাসক হযরত ওমর (রা.) সাধারণ মানুষের মত জীবনযাপন করতে। দায়িত্বের প্রতি সবসময় সজাগ থাকার ফলে তিনি রাতের আঁধারে ছদ্মবেশে মানুষদের অভাব অনটন জানা ও তা দূর করার জন্য বের হতেন। এ শিক্ষা একমাত্র ইসলাম থেকেই সম্ভব, আর কোনো জীবনব্যবস্থাই কোনো মানুষের এ ধরনের গুণাবলী অর্জনের বিষয়টি শতভাগ নিশ্চিত করতে পারবে না।
এছাড়াও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার রাজনীতিক স্বাধীনতার নামে রাজনীতিকর দলাদলি আর একটি বড় সমস্যা। এরফলে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যাওয়ার আগে তাদের মতভেদ দিয়ে জাতিকে বিভক্ত করে ফেলে। বিভিন্ন ধরনের দলের কারণে সৃষ্ট এ অনৈক্য শুধু যে একটি দেশের উন্নতি ও প্রগতির পথেই বাধা হয়ে দাঁড়ায় তাই নয়, বরং এরই সাথে সাথে তা ভয়ংকর বিবাদ ও দাঙ্গা-হাঙ্গামারও জন্ম দেয়। এছাড়া পাঁচ বছরের জন্য একটি দল ক্ষমতায় গেলে তাকে নামানোর জন্য অন্যান্যদলগুলো আপ্রাণ চেষ্টা করতে থাকে। এর ফলে পাঁচ বছরে জনগণের যে উন্নয়ন হওয়ার কথা ছিল তা ব্যহত হয় এবং সরকারি দল তার ক্ষমতার পাঁচবছর বিরোধীদলকে সামাল দিতেই ব্যস্ত থাকে।
কিন্তু ইসলামের এ ধরনের বিভেদ সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। ইসলামে জনগণ যখন তাদের সিদ্ধান্ত অনুসারে নেতা নির্বাচিত করবে তার পর সে নেতার কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা ফরজ। ইসলামে গ্রুপিং করে বা আলাদা দলকে সে নেতার পিছনে উঠে-পড়ে লাগার কোনো সুযোগ নেই। নেতা যদি জনগণের প্রত্যাশা তথা ন্যায়, শান্তি ও সুবিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হন তখন তিনি দার্য়িত্ব হস্তান্তর করবেন। প্রচলিত গণতন্ত্র যতটা না বিক্ষিপ্ত, বিশৃঙ্খল ও স্বার্থপর, প্রকৃত ইসলমের নীতি ঠিক ততটাই ঐক্যবদ্ধ, সুশৃঙ্খল ও উদার। তাই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার তুলনায় ইসলামিক ব্যবস্থা সর্বোপরী উত্তম।
আর অর্থনীতিক ব্যবস্থার কথা যদি বলি তাহলে পুঁজিবাদী অর্থনীতির ঋণাত্মকতা নিয়েই আরেকটি প্রবন্ধ লেখা সম্ভব। সুদভিত্তিক এ অর্থনীতির ফলে একদিকে ধনী আরো ধনী হচ্ছে ও দরিদ্ররা দিনকেদিন হতদরিদ্রে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু ইসলামের সুদবর্জিত ও বণ্টনের নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত অর্থনীতির ফলে অর্থ ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহার হয়। ইসলাম সম্পদ কুক্ষিগত করার বদলে সম্পদের অবাধ গতিশীলতাকে উৎসাহিত করে। আর তাই পুরো সমাজ উপকৃত হয়। ইতিহাস সাক্ষী, আল্লাহ প্রদত্ত নীতি অনুসারে প্রতিষ্ঠিত ইসলামের অর্থনীতি মুসলিম জাহানকে এমন এক অবস্থায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছিল যে যাকাত দেয়ার লোক খুঁজে পাওয়া যেত না। তাই প্রচলিত ধারার গণতন্ত্র থেকে জীবনব্যবস্থা হিসেবে ইসলাম সবদিক থেকেই উত্তম ও যুগোপযোগী।
পরিশেষে বলা যায়, আধুনিক বিশ্ব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অভাবনীয় উন্নতি করলেও মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা ও আত্মার শান্তি নিশ্চিত করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। ইতিহাস সাক্ষী, মানবরচিত যে কোনো তন্ত্র-মন্ত্রই শেষ পর্যন্ত ব্যক্তিস্বার্থ আর শোষণের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে প্রচলিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা যেখানে সংখ্যাতত্ত্বের দোহাই দিয়ে ন্যায়বিচারকে বলি দেয় এবং সমাজকে বিভেদে জর্জরিত করে, সেখানে আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থাকে গ্রহণ করা ছাড়া শান্তি আসা অসম্ভব।
অতএব, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করার জন্য, সে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য, মানুষকে তার প্রকৃত অধিকার ফিরিয়ে দিতে- আল্লাহর দেয়া শেষ জীবনবিধান, প্রকৃত ইসলামকে গ্রহণ করতে হবে। অন্যাথায় প্রচলিত ধারার গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা আমাদের মুক্তির পথকে ধ্বংস করে দিয়ে আমাদের দেশ ও জাতিকে অন্ধকার আস্তাকুঁড়ে পৌঁছে দিবে। তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় এখনই।



















