শাহাদৎ হোসেন:
ইসলাম নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু সাধারণ ধারণা আছে। ছোটবেলা থেকে আমরা পরিবার ও চারপাশে যা দেখে বড় হই, ধরে নিই সেটাই বুঝি সঠিক। কিন্তু কখনো কি একটু গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, আজ আমরা যে ইসলাম পালন করছি, বিশ্বনবী রহমাতাল্লিল আলামিন হযরত মুহাম্মাদ (সা.) এবং তাঁর সাহাবীদের পালিত ইসলাম এমন ছিল কি না? ইতিহাস বলে, বর্তমানের প্রচলিত ইসলামের সাথে রাসুলের (সা.) শেখানো ইসলামের পার্থক্য বিস্তর। কালের পরিক্রমায় আল্লাহর দেওয়া রসুল (সা.) এর প্রতিষ্ঠিত সেই প্রকৃত ইসলাম থেকে আজ আমরা অনেক দূরে অবস্থান করছি।
ইসলাম আসলে কেমন?
ইসলাম কোনো প্যাকেটজাত আচার-অনুষ্ঠানের নাম নয়। ইসলাম কেবল মসজিদে বসে তসবিহ টেপা, মিলাদ পড়া বা খানকায় বসে আধ্যাত্মিক সাধনা করার ধর্ম নয়। আমরা ধর্মকে জীবনের একটি ছোট অংশ হিসেবে আলাদা করে ফেলেছি। আমাদের রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষাব্যবস্থা, দণ্ডবিধি- সবকিছুই পরিচালিত হচ্ছে মানুষের বানানো আইনে, আর আমরা কেবল ব্যক্তিগত জীবনে কিছু আচার পালন করছি।
প্রকৃত ইসলাম হলো একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা বা ‘দীন’। এর মূল ভিত্তি হলো তওহীদ অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম। এই ধর্মের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো মানুষের বানানো সমস্ত শোষণমূলক, বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে সেখানে আল্লাহর দেওয়া জীবন বিধান কার্যকর করা, যেন পৃথিবীতে প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

আমরা যেমনটা মনে করি:
একবার আমাদের রুটিন জীবনের দিকে তাকান। আমাদের ছকবাঁধা জীবনটা কেমন? জন্ম নেব, এরপর মক্তবে গিয়ে না বুঝে আলিফ, বা, তা, ছা পড়ব। একটু বড় হলে স্কুল, কলেজ, ডিগ্রি, চাকরি বা ব্যবসা করব। এর মাঝে ব্যক্তিগতভাবে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ব, রমজানের রোজা রাখব, আর শেষ বয়সে পারলে হজ করে আত্মতৃপ্তি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করি। আমাদের বদ্ধমূল ধারণা, এই চেকলিস্ট মেলালেই আমাদের দায়িত্ব শেষ, আমরা কামিয়াব।
আমাদের সমাজ ও রাজনীতির দিকে তাকালেও একই বিভ্রম দেখা যায়। আমরা মনে করি, প্রচলিত ব্যবস্থার মধ্যে কোনো একটি ইসলামী দলকে ভোট দিলেই ইসলামের দায়িত্ব পালন হয়ে গেল। কেউ কেউ আবার ‘মডারেট ইসলাম’ বা ‘গণতান্ত্রিক ইসলাম’-এর স্লোগান দেন। আমরা ভাবি, দেশের সংবিধানের শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ লেখা থাকলে আর রাষ্ট্রপতির অফিসের দেয়ালে ক্যালিগ্রাফি ঝোলানো থাকলেই দেশে ইসলামের জয়জয়কার চলছে।
অনেকে আবার ইবাদতের নতুন মাত্রা আবিষ্কার করেছেন। তারা ভাবেন, সারা বছর নিজের খেয়ালখুশি মতো চলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লে, বছরে একমাস রোজা রাখলে, রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে ইতিকাফ করলেই সব গুনাহ মাফ হয়ে যাবে। এসব করে হয়তো বিশাল আত্মতৃপ্তি পাওয়া যায়, কিন্তু সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা অন্যায় ও জুলুম নিয়ে আমাদের কোনো মাথাব্যথা থাকে না। আমরা কাকে বোকা বানাচ্ছি? আল্লাহকে, নাকি নিজেদেরকে?
আসলে ইসলাম কেমন?
এ প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায় রসুল (সা.) এর একটি হাদিসে। রসুল (সা.) একটি চমৎকার উপমা দিয়ে বলেছেন, “ইসলাম একটি ঘর, তওহীদ হচ্ছে তার ভিত্তি, নামাজ তার খুঁটি, আর জিহাদ হলো ছাদ।” (তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ) একটি ঘরে খুঁটির কাজ কী ও ছাদের কাজ কী? ঘরের প্রধান যে উদ্দেশ্য রোদ বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়া, সেটা সম্ভব হয় ছাদের কারণে। আর ছাদকে উপরে ধরে রাখার জন্য দরকার হয় খুঁটি। যদি কোনো ঘরে ছাদ না থাকে তাহলে খুঁটির কোনো দরকার নেই। আবার যদি খুঁটি না থাকে তাহলে ছাদ দেওয়া অসম্ভব। রসুল (সা.) জেহাদকে ছাদের সঙ্গে তুলনা করে বোঝালেন ইসলামের মহাগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জেহাদ। আর খুঁটির সাথে নামাজের তুলনা করে বোঝালেন- নামাজের উদ্দেশ্য হলো জেহাদকে সমুন্নত রাখা। তার থেকেও বড় কথা হলো তিনি বলেছেন ইসলাম নামক ঘরটির ভিত্তি হলো তওহীদ। আমাদের সেই ভিত্তিও নেই সেই ভিত্তি তৈরির সংগ্রাম জেহাদও নেই।
মানুষ সৃষ্টির সময় ফেরেশতারা আল্লাহর কাছে একটি শঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তারা বলেছিলেন, মানুষ পৃথিবীতে ফাসাদ (অশান্তি, অবিচার) এবং সাফাকুদ্দিমা (রক্তপাত) করবে। এই অশান্তি ও রক্তপাত থেকে মানুষকে বাঁচানোর জন্যই আল্লাহ যুগে যুগে তাঁর জীবনব্যবস্থা বা ‘দীন’ পাঠিয়েছেন। এই দীনের নামই ইসলাম, যার আক্ষরিক অর্থ শান্তি।
ইসলামের মূল ভিত্তি হলো তওহীদ বা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব। তওহীদ মানে শুধু ব্যক্তিগত জীবনে আল্লাহকে বিশ্বাস করা নয়, বরং রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক, বিচারিক এবং সামাজিক জীবনেও একমাত্র আল্লাহর আইনকে মেনে নেওয়া। মানুষের তৈরি আইন দিয়ে সমাজ চালিয়ে ব্যক্তিগতভাবে নামাজ-রোজা করাটা মূলত আল্লাহর সার্বভৌমত্বের সাথে আপস করা। আজ আমরা ছাদ নির্মাণের উদ্দেশ্য ভুলে গিয়ে কেবল খুঁটি নিখুঁত করার পেছনে সারাজীবন ব্যয় করছি।
আল্লাহর রসুল (সা.) এর প্রকৃত ইসলাম কেমন ছিল?
রসুল (সা.) এর সময়ের ইসলাম ছিল একটি গতিশীল এবং বহির্মুখী ব্যবস্থা। সেই ইসলাম কোনোভাবেই স্থবির বা জড় পদার্থ ছিল না। মাত্র দশ বছরের রাষ্ট্র পরিচালনায় রসুল (সা.) আঠাত্তরটি সামরিক অভিযান ও যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। তার ওফাতের পর তার হাতে গড়া উম্মতে মোহাম্মদী জাতি তৎকালীন পৃথিবীর দুই পরাশক্তি রোমান এবং পারস্য সাম্রাজ্যকে সামরিকভাবে পরাজিত করে শান্তির পতাকা উড়িয়েছিল।
সেই সময়ের ইসলামে ধর্ম ও রাষ্ট্র আলাদা কোনো বিষয় ছিল না। রাষ্ট্রশক্তি ছাড়া ইসলাম যে অর্থহীন, তা সেই যুগের প্রতিটি মুসলিম জানতেন। মসজিদে নববী শুধু উপাসনালয় ছিল না; এটি ছিল একাধারে সংসদ ভবন, সামরিক সদর দপ্তর এবং সুপ্রিম কোর্ট। সেখানে একদিকে যেমন নামাজ হতো, তেমনি রাষ্ট্রপরিচালনা, বিচার-আচারও হতো। যুদ্ধের পরিকল্পনা, সেনাপতি নিয়োগ, রাষ্ট্রদূত প্রেরণ ইত্যাদি কাজও এই মসজিদে নববীতেই হতো।
রসুল (সা.) ও তাঁর সাহাবিরা কেমন ইসলাম পালন করতেন?
রাসুল (সা.) এবং তাঁর সাহাবীদের জীবনের দিকে তাকালে আমাদের এই কথিত ‘ইসলাম’ লজ্জায় মুখ লুকাবে। সাহাবীদের কাছে ইসলাম পালন মানে কেবল হুজরায় বসে জিকির করা ছিল না। তারা কালেমা পড়ে মুমিন হওয়ার পর নিজেদের জীবন ও সম্পদকে পুরোপুরি আল্লাহর কাছে সোপর্দ করে দিয়ে আল্লাহর দীন প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন। তারা ছিলেন একদল দুর্ধর্ষ, মৃত্যুভয়হীন যোদ্ধা।
তারা নিজেদের স্বাভাবিক কাজ, পরিবার, ব্যবসা-বাণিজ্য আর আরাম-আয়েশ বিসর্জন দিয়ে দীন প্রতিষ্ঠার কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তাবুক অভিযানের দিকে তাকালেই তা বোঝা যায়। প্রচণ্ড গরম, ফসল কাটার সময়, অথচ রোমান সাম্রাজ্যের মতো পরাশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ডাকে সাড়া দিয়ে তারা নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলেন। তাদের কাছে অগ্রাধিকার বা প্রায়োরিটি একেবারে পরিষ্কার ছিল। তারা জানতেন, সমাজে সত্য দীন প্রতিষ্ঠা করার চেয়ে বড় কোনো ইবাদত নেই।
তারা মৃত্যুকে ভয় পেতেন না বরং শাহাদাতের জন্য উদগ্রীব থাকতেন। তাদের কাছে ধর্মকে কেবল আত্মার ঘষামাজা বা ব্যক্তিগত পবিত্রতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাদের ধ্যানজ্ঞান ছিল একটাই- মানুষের বানানো সমস্ত ভুল ও শোষণের ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে সেখানে আল্লাহর তওহীদভিত্তিক জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। তারা কেবল নিজেরা জান্নাতে যাওয়ার চিন্তায় মশগুল ছিলেন না, পুরো মানবজাতিকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে সমাজ থেকে অন্যায়, যুলুম, বৈষম্য দূর করে শান্তি-সম্প্রতি ও ন্যায়-সুবিচারের সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল তাদের জীবনের মূল মিশন।
আজ সময় এসেছে আত্মজিজ্ঞাসার, আত্মসমালোচনার। আমরা কি আল্লাহকে শুধু ব্যক্তিগত উপসানার প্রভু হিসেবে মানব? নাকি জাতীয়, রাষ্ট্রীয় সামষ্টিক জীবনেও আল্লাহর হুকুম প্রতিষ্ঠা করে পূর্ণাঙ্গ ইসলাম মানব? সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে। আত্মপ্রবঞ্চনার ফাঁদ কেটে প্রকৃত ইসলামের দিকে ধাবিত হতে হবে। রসুল (সা.) ও তার সাহাবীরা যে ইসলামকে নিজেদের রক্ত আর ঘাম দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেই সক্রিয়, লড়াকু আর জীবন্ত ইসলামের পথে পা বাড়াতে হবে।
আত্মপ্রবঞ্চনার ফাঁদ কেটে প্রকৃত ইসলামের সন্ধানে
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট



















