সাবিকুন নাহার ইভা:
‘ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ দীন বা জীবনব্যবস্থা’- এ কথাটি আমরা ছোটবেলা থেকেই সর্বত্র শুনে এসেছি। কিন্তু প্রয়োগিক দিকে এসে যখন তাকাই তখন দেখা যায় পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা হিসেবে যে বিষয়গুলো প্রতিষ্ঠিত থাকা দরকার তার কোনোটিই আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত নেই। বরং ইসলাম বর্তমানে অন্যান্য ধর্মগুলোর মতই এক আচারসর্বস্ব ধর্মে পরিণত হয়েছে। কিন্তু একটি দীন বা জীবনব্যবস্থায় ব্যক্তিগতজীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় জীবন পর্যন্ত সকল অঙ্গনের হুকুম বিধান দেয়া থাকবে, আর ইসলামেও তা রয়েছে। মানবজাতি কীভাবে চললে শান্তিতে থাকতে পারবে, সমাজে ন্যায়, নিরাপত্তা ও সুবিচার নিশ্চিত হবে সে সম্পর্কে সুষ্পস্ট দিকনির্দেশনা ইসলামে রয়েছে। কিন্তু আমরা নব্বই শতাংশ মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হয়েও সে পূর্ণাঙ্গ দীন ইসলামকে বাদ দিয়ে মানবরচিত তন্ত্রমন্ত্র দিয়ে নিজেদের সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালিত করছি। ফলস্বরূপ, আমাদের সমাজে শান্তি, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না বরং দিনকেদিন অন্যায়, অত্যাচার, খুন, ছিনতাই, চাঁদাবাজি ইত্যাদি বেড়েই চলেছে। তাই প্রকৃত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানবসৃষ্ট ব্যবস্থাকে বাদ দিয়ে ইসলামকে শুধুমাত্র আচার-অনুষ্ঠানের গণ্ডি থেকে বের করে এনে পূর্ণাঙ্গ দীন হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, অর্থাৎ ইসলামের নীতি অনুসারে শাসনব্যবস্থা, বিচারব্যবস্থা, অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করতে হবে।
কিন্তু ইসলামের এ পূর্ণাঙ্গ রূপ সম্পর্কে আমাদের অনেকেরই আকিদা বা সম্যক ধারণা নেই। ইসলামকে পূর্ণাঙ্গ দীন হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত আমাদের সকলকে একসাথে নিতে হবে তাই প্রথমে ইসলামের এ পূর্ণাঙ্গ রূপ সম্পর্কে আমাদের সকলেরই জানা থাকা জরুরী। বর্তমানে আমরা ইসলামের প্রতিটি আমল অর্থাৎ সালাহ, যাকাত, হজ, সওম ইত্যাদি সবকিছুই জাঁকজমকের সাথে পালন করে আসছি। কিন্তু ইসলামে এ সকল কার্যক্রমেরই একটি আকিদা বা উদ্দেশ্য আছে। সে আকিদা না বুঝার ফলে আমাদের এ আমলগুলোও যথাযথভাবে সম্পন্ন হচ্ছে না। অবশ্যই আমার এ কথার সাথে প্রকৃত আলেমরা একমত হবেন কারণ আকিদা ভুল হলে ঈমান ভুল হবে আর ঈমান ভুল হলে যে আমলও ভুল হবে তা সর্বজনবিদিত। তাই শুরুতেই আমাদের জানতে হবে ইসলাম আসার উদ্দেশ্য কী?
ইসলাম শব্দের আক্ষরিক অর্থই শান্তি। অর্থাৎ ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়া অর্থই হলো সেখানে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। আর সমাজে সাধারণ মানুষের জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হলেই মানুষ শান্তি লাভ করতে পারে। তাই ইসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য জানার জন্য আমরা আল্লাহর রসুলের সময়কার দুইটি ঘটনা বিশ্লেষণ করতে পারি। “একদিন আল্লাহর রসুল (স.) কা’বা শরীফের দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন। সময়টা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তিনি ও তাঁর সাহাবীগণের (রা.) ওপর প্রচণ্ড বাধা এবং অবর্ণনীয় নির্যাতন নিপীড়ন চলছিল। এমন সময় একজন সাহাবা, খাব্বাব (রা.) তাঁকে বললেন, ‘হে আল্লাহর রসুল! এই অত্যাচার নিপীড়ন আর সহ্য হচ্ছে না। আপনি আল্লাহর কাছে দোয়া করুন আমাদের বিরোধীরা সব যেন ধ্বংস হয়ে যায়।’ কথাটাকে আল্লাহর রসুল যথেষ্ট গুরুত্ব দিলেন। তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং ঐ সাহাবাকে বললেন, ‘তুমি কী বললে?’]
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

‘ইয়া রসুলাল্লাহ! এত নির্যাতন নিপীড়ন আর সহ্য হচ্ছে না। আপনি বরং ওদের ধ্বংস হবার দোয়া করে দিন।’ – খাব্বাব (রা.) তার কথার পুনরাবৃত্তি করলেন। কিন্তু আল্লাহর রসুল খাব্বাবের অনুরোধ শুনে ধ্বংসের দোয়া করলেন না। তিনি বললেন, ‘শোন, শীঘ্রই সময় আসছে যখন কোনো যুবতী মেয়ে গায়ে গহনা পরে একা সা’না থেকে হাদরামাউত যাবে। তার মনে এক আল্লাহ এবং বন্য জন্তু ছাড়া আর কোন ভয় থাকবে না।’ [খাব্বাব (রা.) থেকে বোখারী ও মেশকাত]।”
দ্বিতীয় আরেকটি ঘটনার উল্লেখ করছি। “আদী ইবনু হাতিম (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন আমি নবী (সা.) -এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় তার কাছে এক লোক এসে দরিদ্রতার অভিযোগ করল। এরপর আরেক লোক এসে পথে ডাকাতির অভিযোগ করল। তখন তিনি আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আদী! তুমি কি হীরাহ দেখেছ? কুফার একটি প্রসিদ্ধ শহর (বর্তমানে ’ইরাকের একটি প্রদেশ) যদি তুমি দীর্ঘদিন বেঁচে থাক তাহলে অবশ্যই দেখতে পাবে যে, একটি মহিলা হীরাহ থেকে ভ্রমণ করে মক্কায় গমন করবে এবং নিরাপদে কা’বা ঘর তাওয়াফ করবে, অথচ এক আল্লাহ তা’আলা ছাড়া তার অন্তরে আর কারো ভয় থাকবে না (বোখারী)।”
এই হাদীস দুুটি থেকেই আমরা ইসলামের উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে জানতে পারি। প্রথমত, আল্লাহর রসুল (স.) উদাহরণস্বরূপ বললেন- মেয়ে মানুষ বা মহিলা, কোনো পুরুষের কথা বললেন না। কারণ নারীদের প্রাণ ও সম্পদ ছাড়াও আরও একটি জিনিস হারাবার সম্ভাবনা আছে যা পুরুষের নেই। সেটা হল ইজ্জত, সতীত্ব, সম্ভ্রম। দ্বিতীয়ত, ঐ নারী বয়সে যুবতী। অর্থাৎ লোভাতুরদের কাছে আরও লোভনীয়। তৃতীয়ত, অলঙ্কার গহনা পরিহিত, চোর ডাকাতের জন্য লোভনীয়।
এতগুলো লোভনীয় বিষয় থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর রসুল বলছেন, অনুরূপ একটি অলঙ্কার পরিহিত যুবতী নারী একা সা’না শহর থেকে প্রায় সাড়ে ছয়শো কিলোমিটার দূরবর্তী হাদরামাউতে যেতে পারবে। আবার অন্যত্র বললেন হীরাহ থেকে মক্কা যা প্রায় পনেরশো কিলোমিটার দূরত্বের পথ। উভয় ঘটনাতেই এ যাত্রা অন্তত কয়েক সপ্তাহের ব্যাপার। এত দীর্ঘ পথে তার ধনসম্পদ বা ইজ্জত হারানোর কোনো আশঙ্কা থাকবে না। সেই নারী কোন ধর্মের বা গোত্রের তারও উল্লেখ রসুল করেননি। অর্থাৎ, সব ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের নারীর জন্যই এই অভাবনীয় নিরাপত্তাটি কায়েম হবে। ইসলামের উদ্দেশ্য বুঝতে এ দুটো ঘটনাই যথেস্ট।
কিন্তু আমাদের আশেপাশে তাকলেই দেখা যায় যে, আমরা আজ সারা বিশ্বে মার খেয়ে যাচ্ছি। আমাদের দেশের মধ্যেও আমাদেরকে প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হচ্ছে। তাহলে স্পষ্টতই আমাদের সামজে ইসলাম চর্চিত হচ্ছে না, ইসলামের কোনো প্রতিষ্ঠা নেই; যদি থাকত তাহলে আমরা একই সাথে অশান্তি ও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতাম না। ইতিহাস সাক্ষী ইসলাম শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল, তাই যদি আমাদের সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা না থাকে তাহলে বুঝতে হবে আমাদের প্রয়োগেই ভুল হচ্ছে, আমাদের আকিদাতে ত্রুটি রয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের প্রতিটি ইবাদত ও আমলের পেছনেই একটি নির্দিষ্ট আকিদা বা উদ্দেশ্য রয়েছে। তেমনি ইসলামেরও একটি পূর্ণাঙ্গ আকিদা ও উদ্দেশ্য রয়েছে। যদি পূর্ণাঙ্গভাবে আমরা ইসলামকে গ্রহণ না করে শুধুমাত্র আচারসর্বস্ব করে রাখি এবং ব্যক্তিগত আত্মতৃপ্তি নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি তবে আমাদের এ সন্তুষ্টি মিথ্যে হবে। কারণ নব্বই শতাংশ মুসলমানদের দেশেও যদি শান্তি ও নিরাপত্তা না আসে, দুর্নীতি, ঘুষ, চাঁদাবাজী, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি চলতেই থাকে, নারীদের প্রতিনিয়ত সবজায়গায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়- অর্থাৎ এক কথায় সব ধরনের অন্যায় চলতেই থাকে; তবে বুঝতে হবে আমাদের বিশ্বাস ও প্রয়োগের শিকড়েই কোথাও বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে।
অতএব, আমাদের প্রিয় নবী হুজুরে পাক (স.) যে নিরাপদ সমাজের রূপরেখা দিয়ে গিয়েছিলেন, যেখানে একজন নারী কোনো ভয় ছাড়া শত শত মাইল একা পাড়ি দিতে পারত, সেই সমাজ কেবল স্বপ্ন দেখে নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে ইসলামকে তার পূর্ণাঙ্গ রূপে বাস্তবায়নের মাধ্যমেই অর্জন সম্ভব। তাই আসুন, আমরা কেবল নামসর্বস্ব ধর্মের গণ্ডি ভেঙে ইসলামের মূল আকিদা ও উদ্দেশ্যে ফিরে আসি। তবেই সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার দূর হবে এবং আমরা সেই কাক্সিক্ষত শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরে পাব, যার সাক্ষী ইতিহাস, যার সুখবর আমাদের প্রিয় রসুল (স.) বহু আগেই দিয়ে গিয়েছেন। (শিক্ষার্থী, ইডেন মহিলা কলেজ)
[ বিস্তারিত জানতে বা যোগাযোগের জন্য সরাসরি কল বা হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠান: ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৬২১৪৩৪২১৩ ]



















