মো. নিজাম উদ্দিন
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় হেযবুত তওহীদের এমামের ভিডিও বক্তব্যগুলো ভীষণ আলোড়ন তুলেছে। সেগুলো দেশের গণ্ডি পেরিয়ে যখন ইউরোপ আমেরিকার লোকজনের কাছে যাচ্ছে, তখন আমরা ভিন্ন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখতে পাচ্ছি। কারণ পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলাম সম্পর্কে প্রচণ্ড ভয় কাজ করে। তারা ইসলামকে অত্যন্ত প্রতিহিংসাপরায়ণ, অসহিষ্ণু ও অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষী একটি ধর্ম বলে মনে করে। তারা অনেকে ইসলামি কন্টেন্ট একেবারেই দেখতে রাজি না, তাদের দেশে সেগুলো প্রচার হোক এটারও তারা ঘোর বিরোধী। কিছুদিন আগে ফেসবুকে হেযবুত তওহীদের একটি পোস্টে চধঁষ ঝুঁফধস নামের একজন মার্কিন নাগরিক মন্তব্য করেছেন, “Keep your disgusting religion where its welcome. Thats not America. You scum arent fooling us. -James Aaron Crofford নামের আরেকজন লিখেছেন, “This is a religion of hate for other religions!”
প্রশ্ন হচ্ছে, ইসলামের প্রতি তাদের এই ঘৃণা, বিদ্বেষের কারণ কী? ইসলামবিদ্বেষী মহলের অন্যতম প্রোপাগান্ডা হলো ইসলাম বিকশিত হয়েছিল তলোয়ারের জোরে, রক্তপাতের মধ্য দিয়ে। কেন এই রক্তপাত? তারা বলেন, এই রক্তপাত সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য, পরসম্পদ লুণ্ঠনের জন্য। কখনই নয়, এটি নিঃসন্দেহে সত্যের অপলাপ। যদি কেবল সাম্রাজ্য বিস্তার করাই ইসলামের উদ্দেশ্য হত, পরসম্পদ লুণ্ঠন করার জন্য ইসলামের জিহাদ-কিতালের বিধান হত, তাহলে ৭৮টি যুদ্ধ করার পরে আল্লাহর রসুল কুড়েঘরে ইন্তেকাল করতেন না, তিনি ইন্তেকাল করতেন সুরম্য অট্টালিকায়, আর ইন্তেকালের সময় প্রাসাদ ভর্তি সাজানো থাকত রাশি রাশি ধন-সম্পদ। অথচ আল্লাহর রসুল ইন্তেকালের সময় কী কী রেখে গেছেন সেই তালিকাটি দেখলে অবাক হতে হয়।
সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য যুদ্ধ করেছে চেঙ্গিস খান, হালাকু খান। তাদেরকে কেউ হৃদয়ে স্থান দেয়নি, তারা কোনো সোনালি ইতিহাসও রেখে যেতে পারেননি। মৃত্যুর সাথে সাথে তাদের প্রভাপ-প্রতিপত্তি লুপ্ত হয়ে গেছে। অন্যদিকে আল্লাহর রসুল বিগত ১৪০০ বছর ধরেই পৃথিবীর সবচাইতে প্রশংসিত ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব। আজও তাঁর ১৬০ কোটি অনুসারী ‘নামধারী’ হালতে হলেও বিশ্বের বুকে টিকে আছে। বহু মানুষ রয়েছেন হয়ত ঠিকমত নামাজ পড়েন না, ধর্মকর্মে মনোযোগী নন, কিন্তু রসুলকে গালি দিলে সহ্য করতে পারেন না। এতটা অপার্থিব ভালোবাসা, অকৃত্রিম শ্রদ্ধা বোধহয় পৃথিবীর অন্য কাউকে করা হয় না। কোথা থেকে আসে এই শ্রদ্ধা, এই আবেগ? এমনি এমনিই তৈরি হয়ে গেছে? শুধুই পরকালের ভয়ে মানুষ রসুলকে শ্রদ্ধা করে? মোটেও নয়। এমন একটি আলোকময় আদর্শকে আল্লাহর রসুল (সা.) প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, যার ব্যাপ্তি দেহ থেকে আত্মা, ইহজগত থেকে পরজগত, অতীত থেকে ভবিষ্যত- সমস্তকেই আবৃত করে রেখেছে।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

মুসলিমদের একটি দল প্রবলভাবে হীনম্মন্যতায় আপ্লুত। ইসলামের জিহাদ-কিতাল নিয়ে তারা পড়েছেন মহাবিপদে। জিহাদ কিতালের কথা কোর’আন হাদিসে আছে, কাজেই অস্বীকার করা যাচ্ছে না, আবার যেভাবে বিষয়টি উপস্থাপিত হচ্ছে সেটাকে মেনে নেওয়াও যাচ্ছে না। ইসলামবিদ্বেষীরা যখন কোর’আন ও হাদিস থেকে জিহাদ-কিতাল সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো সামনে হাজির করেন এবং সেগুলোর অপব্যাখ্যা দিয়ে ইসলামকে রক্তপাতের দায়ে অভিযুক্ত করেন এবং আল্লাহর রসুলকে যুদ্ধবাজ ও নির্মম ব্যক্তিত্ব (নাউজুবিল্লাহ) হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন তখন এই হীনম্মন্যতায় আপ্লুত শ্রেণিটি করজোড়ে কাচুমাচু হয়ে এমনভাবে কৈফিয়ত প্রদান করেন যার দ্বারা প্রকারান্তরে ইসলামবিদ্বেষীদের অভিযোগগুলোকে স্বীকারই করে নেওয়া হয়। এমনটা হবার পেছনে পাশ্চাত্যের মিডিয়ার বহুমুখী প্রোপাগান্ডার দায় থাকলেও মূল কারণ কিন্তু সেটা নয়। মূল কারণটি হলো প্রকৃত ইসলামের আকীদা না জানা। জিহাদ ও কিতাল সম্পর্কে আকীদা না থাকার কারণে তারা বলিষ্ঠ কণ্ঠে কোনো অভিযোগেরই সদুত্তর দিতে পারেন না।
একটা অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি করা যায়, আবার ওই অস্ত্র দিয়েই ডাকাত নির্মূল করা যায়। অস্ত্র দোষী নয়, দোষী সেই ব্যক্তি, যে অস্ত্রের অপব্যবহার করে। জিহাদ হচ্ছে অন্যায়, অবিচার, নির্যাতন, নিপীড়নের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রামের নাম। এই সংগ্রামের চূড়ান্ত রূপকে বলা হয় কিতাল (সশস্ত্র যুদ্ধ)। জিহাদ ব্যক্তির, কিতাল রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে কিতাল হয়। মানবজাতির ইতিহাসে কোনোকালেই জিহাদ-কিতাল অবৈধ ছিল না, হওয়াটা যৌক্তিকও নয়। কারণ, অন্যায় থাকলে অন্যায়ের প্রতিবাদও থাকবে এটাই স্বাভাবিক। একমাত্র তখনই জিহাদ-কিতালকে আপনি অবৈধ বলতে পারবেন যখন পৃথিবীর এক ইঞ্চি মাটিতেও কোনো অন্যায়, অবিচার, যুলুম থাকবে না, পরিপূর্ণভাবে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হবে। সে সময় এখনও আসে নি। প্রতিটি রাষ্ট্রই সেনাবাহিনী প্রতিপালন করে সেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য, বহিঃশত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য। সেনাবাহিনীর পেছনে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার ব্যয় করে রাষ্ট্রগুলো। উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়, নতুন নতুন যুদ্ধসামগ্রী ও যুদ্ধযান ক্রয় করা হয়।
এই যে সেনাবাহিনীকে এত সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা প্রদান করা হয়, এর একটাই কারণ- দেশের যে কোনো বিপদে রাষ্ট্রের এই বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নাগরিকগুলো জনগণের পাশে দাড়াবে, জনগণকে শত্রুর আঘাত থেকে রক্ষা করবে। যুদ্ধ করবে। মরবে ও মারবে। পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী গড়ে তোলাকে নিশ্চয় কেউ অন্যায় বলছেন না, কারণ একটা রাষ্ট্রের এটা সর্বকালের স্বীকৃত অধিকার। তাহলে রসুল (সা.) রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে যুদ্ধ/কিতাল করেছেন সেটা কেন সমালোচনার বিষয় হবে? ইসলামের জিহাদ-কিতাল নিয়ে কেন এত অপপ্রচার হবে? যুদ্ধ বৈধ, ডধৎ বৈধ, কিন্তু ‘কিতাল’ অবৈধ- এটা কেমন কথা? কিতাল, যুদ্ধ বা ডধৎ তো একই জিনিস। জিহাদ-কিতাল ইসলামিক টার্ম বিধায় এটা অবৈধ নয়, অবৈধ হচ্ছে এই শব্দগুলিকে ব্যবহার করে সন্ত্রাস সৃষ্টি করা। ওটা অন্যায়। ইসলাম অন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধ করা দূরের কথা, মানুষের ক্ষতি হয় এমন কাজ কিংবা কথা বলাকেও অন্যায় সাব্যস্ত করে।
পৃথিবীর সকল স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি আছে, প্রতিরক্ষানীতি আছে। ১৪০০ বছর আগে স্থাপিত মদীনা রাষ্ট্রেরও পররাষ্ট্রনীতি ছিল, প্রতিরক্ষানীতি ছিল। কোর’আনের যুদ্ধ-সংক্রান্ত আয়াতগুলোই ছিল মদীনা রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষানীতি। যুদ্ধের হুকুম, রক্তপাতের অনুমতি ও শত্রুহত্যার বৈধতা কেবল কোর’আনে নয়, সব সংবিধানেই আছে। হ্যাঁ, কেউ যদি কোর’আনের মনগড়া ব্যাখ্যা দিয়ে সন্ত্রাস সৃষ্টির পাঁয়তারা করে তার সমালোচনা আমরা অবশ্যই করব। নিঃসন্দেহে সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু এজন্য কোর’আনকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে চাওয়া নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছু নয়। ফাঁসিতে ঝুলানো হয় খুনিকে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলকে নয়।
সুতরাং, যাবতীয় অপপ্রচার ও অপবাদের তীরকে ভয় না পেয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বলার সময় এসেছে, ‘আল্লাহ হক্ব, রসুল হক্ব, কোর’আন হক্ব, ইসলাম হক্ব।’ আমরা যদি আল্লাহ-রসুলের প্রকৃত ইসলামকে উপলব্ধি করতে পারি এবং নিজেরা সেই ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারি তাহলে নিঃসন্দেহে বলা যায়, ইসলাম আমাদের হীনম্মন্যতার কারণ হবে না, ইসলাম হবে আমাদের আদর্শিক শ্রেষ্ঠত্বের কারণ, ইসলাম আমাদের দুর্বলতা নয়, ইসলাম আমাদের শক্তি, আমাদের মর্যাদা, আমাদের গর্ব। ইনশা’আল্লাহ সমস্ত অপপ্রচারের কালো মেঘ কেটে গিয়ে প্রকৃত ইসলামের আদর্শ সূর্যের মত আলোকিত করবে সারা পৃথিবীকে। কেটে যাবে অন্যায় ও অসত্যের অন্ধকার। মূলত ইসলাম দিয়েই সমস্ত অন্যায়, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা, জঙ্গিবাদ, মাদক ইত্যাদি নির্মূল সম্ভব। শুধু দরকার বিকৃতির পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে থাকা সহজ-সরল অনাবিল প্রকৃত ইসলামটিকে তুলে এনে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা।
[লেখক: সাধারণ সম্পাদক, হেযবুত তওহীদ
যোগাযোগ: ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৬২১৪৩৪২১৩]



















