হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম:
উগ্রবাদ ইতোমধ্যে একটি বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীর প্রধান ধর্মগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই কোনো না কোনোভাবে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর অস্তিত্ব দেখা যায়। শুধু ধর্মের নামেই নয়, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শকে কেন্দ্র করেও বিশ্বজুড়ে নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে। বিশেষত ইসলাম ধর্মের নামে উগ্রবাদ গত পঁয়ত্রিশ বছরে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে।
সাধারণত উগ্রবাদী ধারণার পেছনে একটি মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা কাজ করে। যখন কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠী অন্য কোনো জাতি, রাষ্ট্র বা শক্তির দ্বারা আক্রান্ত হয়, তাদের জানমালের ক্ষতি হয়, তারা উদ্বাস্তু বা লাঞ্ছিত হয়, তখন তারা প্রতিশোধ (retaliation) বা মুক্তির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। একদিক থেকে এসব কর্মকাণ্ডকে জাতীয়তাবাদী বা মুক্তি আন্দোলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়; কিন্তু বিপরীত দিক থেকে তাদেরকে সন্ত্রাসবাদী হিসেবে দেখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ও মাস্টারদা সূর্যসেন ভারতীয়দের চোখে ছিলেন বিপ্লবী, কিন্তু ব্রিটিশদের দৃষ্টিতে তারা ছিলেন সন্ত্রাসী।
আজ ইউরোপসহ বিভিন্ন পাশ্চাত্য সভ্যতার দেশে মুসলমানদের ক্ষেত্রে অহরহ উগ্র (Extreme), গোড়া (Bigoted), জঙ্গি (Militant), সন্ত্রাসী (Terrorist), চরমপন্থী (Extremist) এই ধরনের পরিভাষা প্রয়োগ করা হচ্ছে। এর উদাহরণ হিসেবে মধ্য এশিয়া ও আরব অঞ্চলে গড়ে ওঠা কিছু সংগঠন যেমন আল-কায়েদা, ইসলামিক স্টেট, তালেবান, লস্কর-ই-তৈয়বা, আফ্রিকার আল শাবাব, বোকো হারাম ইত্যাদির নাম উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এসব উগ্রবাদী গোষ্ঠী গড়ে ওঠার পেছনে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা রয়েছে, সেটা নিয়ে আলোচনা করা হয় না।
মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

আজ থেকে কয়েকশ বছর আগে ইউরোপীয় শক্তিগুলো সামরিক শক্তিবলে সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে পদানত করে এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত করে ‘উন্নত মানবিক সভ্যতা’ উপহার দেওয়ার নাম করে শাসন ও শোষণ চালায়। পরবর্তীতে তারা নিজেরাই দুইটি বিশ্বযুদ্ধের মাধ্যমে প্রায় পনেরো কোটি মানুষকে হত্যা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিভিন্ন দেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও তাদের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, শাসন কাঠামোয় বিশৃঙ্খলা এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা রয়ে যায়। একই সঙ্গে পূর্বতন প্রভু ও পরাশক্তিধর রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপও অব্যাহত থাকে। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর ফিলিস্তিনে তাদের দখলদারির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে ওঠে। একইভাবে ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধেও প্রতিরোধ সংগ্রাম শুরু হয়। কিন্তু এসব আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রায়ই উগ্রবাদী বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে যাদের জীবন ও দেশ আক্রমণের শিকার হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে তারাই উল্টো ‘সন্ত্রাসী’ ট্যাগ পেয়েছে। ২০০১ সালের টুইন টাওয়ার হামলার পর ‘ওয়ার অন টেরর’ ঘোষণা করা হয় এবং কথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়।
ইসলামের মৌলিক নীতিমালা
ইসলাম এসেছে সকল ফেতনা ও সন্ত্রাস নির্মূল করতে; তাই ইসলামে উগ্রবাদের সমর্থন থাকার প্রশ্নই আসে না। ইসলাম যুক্তিহীন, বাস্তবতাবিবর্জিত, বিজ্ঞানবিরোধী বা অন্ধ উগ্রতার ধর্ম নয়। আল্লাহর দীন মানুষের জাগতিক ও আধ্যাত্মিক, দুনিয়া ও আখেরাত, দেহ ও আত্মার সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনের (Balanced life) নিশ্চয়তা দেয়। এখানে দয়া, করুণা, সততা, আমানতদারি ও সংযমের শিক্ষা রয়েছে; পাশাপাশি রয়েছে যাবতীয় অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে জেহাদ (সংগ্রাম) করার নির্দেশ। সৎকাজের আদেশ যেমন রয়েছে, তেমনি অসৎকাজে বাধা দেওয়ার হুকুমও রয়েছে। এজন্যই প্রকৃত ইসলামের অনুসারীদের বলা হয়েছে ‘উম্মাতে ওয়াসাতা’ – অর্থাৎ ভারসাম্যপূর্ণ জাতি (সুরা বাকারা ১৪৩)। ইসলাম মানুষের জন্মগত অধিকারগুলোর (Natural rights) ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়, যেসব অধিকারের কথা ইউরোপীয় দার্শনিক হবস ও লকের দর্শনেও উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মানুষের স্বাধীনভাবে জীবনযাপন এবং সম্পদের নিরাপত্তার (Life, Asset, and Liberty) অধিকার।
ইসলামের আরেকটি মূলনীতি হলো, এই দীনে কোনো জবরদস্তি নেই (সুরা বাকারা ২:১৫৬)। ইসলাম কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে শরিয়তের কোনো বিধান ব্যক্তিগতভাবে চাপিয়ে দেয় না, কাউকে ধর্মন্তরিত হতেও বাধ্য করে না। আল্লাহ বলেন, তিনি কাউকে তার সাধ্যের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেন না (সুরা বাকারা ২:২৮৬)। তিনি আরো বলেন, অন্যায়ভাবে একজন মানুষকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমতুল্য (সুরা মায়েদা ৫:৩২)। একের অপরাধে অন্যকে শাস্তি দেওয়া যাবে না (সুরা বনি ইসরাইল ১৭:১৫)। ইসলামের উদ্দেশ্য এমন একটি জীবনপদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা যা মানুষকে আত্মিকভাবে পরিশুদ্ধ করবে এবং সমাজ থেকে অন্যায় অবিচার নির্মূল করে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।
বিশ্ব পরিস্থিতি ও বাংলাদেশে উগ্রবাদের প্রেক্ষাপট
গত তিনশত বছরের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে বলা যায়, প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন, পররাজ্য দখলের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং অস্ত্রের বাজার সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর আগ্রাসন ও উপনিবেশবাদী মানসিকতাই উগ্রবাদের মূল জন্ম দিয়েছে। আফগানিস্তান ও ইরাকে সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর হামলার বিরুদ্ধে এবং সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে ইসলামের জেহাদী চেতনাকে কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছে সেইসব দেশের মানুষ। তখন অন্যান্য মুসলিম দেশগুলিতেও উগ্রবাদী তৎপরতা ছড়িয়ে পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলেও সহিংসতা এখনও চলমান রয়েছে।
২০২৫ সালে কাশ্মীরের পহেলগামসহ পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে স্কুল বাস ও পুলিশ বাহিনীর ওপর আত্মঘাতী বিস্ফোরণসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী হামলা ঘটেছে। আফগানিস্তান-পাকিস্তান সীমান্তে তেহরিক-ই-তালেবান কেন্দ্রিক সংঘাত তীব্র হচ্ছে। মিয়ানমারে উগ্রবাদী বৌদ্ধ ও সামরিক জান্তার সহিংসতার ফলে ২২ লক্ষ রোহিঙ্গা মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। ফিলিস্তিনে ইসরাইলের দ্বারা লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ নারী ও শিশুর হত্যাযজ্ঞ আশি বছর থেকে চলছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাল্টা আক্রমণ চালিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এতে মধ্যপ্রাচ্যে উগ্রবাদ আরও বৃদ্ধি পাবে।
বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে একটি সহনশীল রাষ্ট্র হলেও, বৈশ্বিক উগ্রবাদের প্রভাব এদেশেও পড়েছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠী বহু বিরুদ্ধমতের মানুষকে কুপিয়ে হত্যা করেছে; হলি আর্টিজানের মতো ভয়ঙ্কর ঘটনাও ঘটেছে। অন্তর্র্বর্তীকালীন সরকারের সময় বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনা ও মাজারে তওহীদী জনতার মবসহ ছয় শতাধিক মব হামলার ঘটনা ঘটেছে; এতে অন্তত ৩২০ জন নিহত এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)।
সমাধান কোন পথে
উগ্রবাদ মোকাবেলায় সরকার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পুলিশ, আইন, ক্রসফায়ার, ফাঁসি ও রিমান্ডের মাধ্যমে শক্তি প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। কিন্তু ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করেও উগ্রবাদ নির্মূল করা যায়নি, কারণ উগ্রবাদীরা তাদের কর্মকাণ্ডকে ঈমানি দায়িত্ব মনে করে। যত বেশি শক্তি প্রয়োগ করা হয়, তাদের ঈমানি চেতনা তত বৃদ্ধি পায় এবং তারা আরও বেপরোয়া ও কৌশলী হয়ে ওঠে। জাতিসংঘের সাবেক মহাপরিচালক বান কি মুনও স্বীকার করেছেন, কঠোর ব্যবস্থা জঙ্গিবাদ আরও বেড়েছে (দৈনিক প্রথম আলো, ১৭ জানুয়ারি ২০১৬)।
এ কারণে উগ্রবাদ মোকাবেলায় শক্তি প্রয়োগের পাশাপাশি আদর্শিক প্রতিরোধ প্রয়োজন। উগ্রবাদীরা কোর’আন ও হাদিসের অপব্যাখ্যা করে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতের ওপর হামলার জন্য মিথ্যা ফতোয়া দিয়ে থাকে। এজন্য ইসলামের অকাট্য দলিলভিত্তিক প্রমাণের মাধ্যমে (Counter-narrative) তাদের অপব্যাখ্যা খণ্ডন করা দরকার। মানুষ যখন এগুলো জানবে, তখন তারা বিভ্রান্ত হবে না এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষাকে অনুসরণ করবে।
সাবেক বিডিআর প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমানও বলেছেন, ‘রাজনীতিকে যেমন রাজনীতি দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে, ইসলামের মধ্যে যারা জঙ্গিবাদ নিয়ে আসছে তাদেরকে কোর’আন-হাদিস দিয়ে মোকাবেলা করতে হবে; সেক্যুলারিজম দিয়ে নয়’ (চ্যানেল আই-তৃতীয় মাত্রা, ১৯ অক্টোবর ২০১৫)।
যুদ্ধসংক্রান্ত আয়াতের সঠিক ব্যাখ্যা
যেহেতু কোর’আন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, এখানে নামাজ, রোজার মতো বিষয়ের পাশাপাশি যুদ্ধনীতি, দণ্ডবিধি ও বিচারব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় বিধানও রয়েছে। তবে বিভিন্ন উগ্রবাদী গোষ্ঠী কোর’আনের জেহাদ, কেতাল এবং কেসাস সংক্রান্ত আয়াতগুলোকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে।
তাদের এসব কর্মকাণ্ড দেখে যদি আমরা জেহাদ বা কেতালের আয়াতগুলোকে অস্বীকার করি, অথবা সেগুলো নিয়ে আলোচনা এড়িয়ে যাই, তাহলে তা হবে এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। কারণ এতে ইসলামভীতি বৃদ্ধি পাবে।
জেহাদের নামে চলমান উগ্রবাদকে মোকাবিলা করতে হলে সর্বপ্রথম জানতে হবে – জেহাদের প্রকৃত অর্থ কী। জেহাদ মানে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা, সংগ্রাম ও বিপ্লব। আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্যায় ও অবিচারপূর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আদর্শিক, নৈতিক ও সামাজিক পর্যায়ে যে সর্বাত্মক আন্দোলন পরিচালিত হয়, সেটিই জেহাদ। আর ‘কেতাল’ অর্থ যুদ্ধ, যা জেহাদের সর্বোচ্চ স্তর। মানবসমাজে বিদ্যমান অন্যায় ও জুলুমের ব্যবস্থাকে উৎখাত করে আল্লাহর দেওয়া ন্যায়ভিত্তিক জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে যে সশস্ত্র সংগ্রাম সংঘটিত হয়, তাকে কেতাল বলা হয়।
জেহাদ ও কেতালের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। জেহাদ একটি ব্যাপক সংগ্রাম, যা দলগত ও সামাজিক পর্যায়ে নানা উপায়ে এবং সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থভাবে পরিচালিত হয়। সত্যের পক্ষে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে মুখে বলা, বই লেখা, চিন্তা-যুক্তির মাধ্যমে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং সভা-সমাবেশের মাধ্যমে আদর্শিক আন্দোলন গড়ে তোলা- এ সবই জেহাদের অন্তর্ভুক্ত।
কিন্তু কেতাল বা যুদ্ধ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছাধীন বিষয় নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় বিষয়। রসুলাল্লাহ (সা.) নবুয়ত লাভের পর থেকেই সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তথা জেহাদ শুরু করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ যুদ্ধের অনুমতি দেন তখনই, যখন তিনি মদিনা নগররাষ্ট্রের রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। অতএব, ব্যক্তিগত উদ্যোগে বা কোনো গোষ্ঠীর সিদ্ধান্তে সশস্ত্র হামলা বা হত্যাকাণ্ড চালানো ইসলামে সম্পূর্ণ অবৈধ। তাই উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো যেভাবে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করে, বিচ্ছিন্নভাবে ভিন্ন ধর্মের বা বিরুদ্ধমতের মানুষের উপর হামলা চালায় সেগুলো স্পষ্টতই সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড; এগুলো জেহাদ বা কেতাল নয়।
একইভাবে, আল্লাহ কোর’আনে কেসাসের বিধান দিয়েছেন (সূরা বাকারা ২:১৭৮)। কেসাসের অর্থ হলো সমপরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণ করা- যেমন প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, সমান আঘাতের বদলে সমান আঘাত ইত্যাদি (সূরা মায়েদা ৫:৪৫)। ইসলামের রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রপ্রধানের নেতৃত্বে একটি পূর্ণাঙ্গ বিচার ব্যবস্থা গঠিত হবে। বিচারকরা তদন্ত, সাক্ষী, প্রমাণ ও স্বীকারোক্তির মাধ্যমে অপরাধীর শাস্তি কার্যকর করবেন। পাশাপাশি, বাদী চাইলে অভিযুক্তকে ক্ষমা করতে পারেন অথবা ক্ষতির অর্থমূল্য গ্রহণ করতে পারেন। তবে এই সিদ্ধান্তও সম্পূর্ণভাবে আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই কার্যকর হবে। এ ধরনের শাস্তি কোনো ব্যক্তি বা মুফতির ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে কার্যকর হতে পারবে না।
কোর’আনে আল্লাহ স্পষ্টভাবে বলেছেন, যারা তাঁর নাজিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার করেন না, তারা কাফের, জালেম ও ফাসেক হিসেবে গণ্য হবেন (সূরা মায়েদা ৫:৪৪, ৪৫, ৪৭)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের নিকটবর্তী কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যাতে তারা তোমাদের মধ্যে কঠোরতা অনুভব করে’ (সূরা তওবা ৯:১২৩)। তাই জনগণকে স্পষ্টভাবে জানতে হবে, কে মো’মেন এবং কে কাফের।
একই সঙ্গে, জেহাদ, কেতাল ও কেসাস সংক্রান্ত আয়াতগুলোর প্রকৃত প্রেক্ষাপট সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করা অত্যন্ত জরুরি। যদি এগুলো যথাযথভাবে বোঝানো না হয়, তাহলে উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো তাদের নিজস্ব ফকিহ, শায়েখ বা মুফতিদের ফতোয়ার ভিত্তিতে এই আয়াত ব্যবহার করে বিচারক ও আইনজীবীদের ওপর হামলা চালাতে পারে। বাস্তবে, আমাদের দেশে আদালত প্রাঙ্গণে উগ্রবাদী গোষ্ঠীর হামলায় বিচারক ও আইনজীবী হত্যার মতো ঘটনাও একাধিকবার ঘটেছে।
জীবনব্যবস্থা পছন্দের অধিকার
তবে উগ্রবাদের বিস্তার ঠেকাতে শুধু বলপ্রয়োগ বা পাল্টা আদর্শ প্রচারই যথেষ্ট নয়, পাশাপাশি প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সমঝোতা ও শক্তিশালী নীতিমালা। মানুষের জন্মগত ও প্রাকৃতিক অধিকার, নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও জীবনধারা পছন্দ করার অধিকার (Self determination), জীবনধারণ ও সম্পদ রক্ষার অধিকার এবং নিজের ভূমিতে বসবাসের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এটি স্পষ্ট ও শক্তভাবে তুলে ধরতে হবে এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। সেটা হলো- মুসলিম রাষ্ট্রগুলোকে আল্লাহর দেওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থা অনুযায়ী পরিচালনা করতে হবে। কারণ বিদ্যমান পশ্চিমা রাষ্ট্রব্যবস্থা অধিকাংশ ধর্মপ্রাণ মানুষের চিন্তাভাবনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ফলে ইসলাম ও পশ্চিমা ব্যবস্থার মধ্যে সংঘাত ও দ্বন্দ্ব সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করছে। আল্লাহ যা হারাম করেছেন বা যা রীতিমতো শিরক, তার অনেককিছুই প্রচলিত ব্যবস্থায় বাধ্যতামূলকভাবে করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, সুদভিত্তিক পুঁজিবাদী অর্থনীতি, যার কারণে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সিন্ডিকেট এবং মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাচ্ছে। মুসলিমরা সুদকে হারাম মনে করলেও রাষ্ট্রব্যবস্থায় সুদের ব্যবহার বাধ্যতামূলক হওয়ায় তাদেরকে তা মেনে চলতে হয়। যে ব্যবস্থাগুলো আল্লাহর হুকুমের বিপরীত, সেগুলোর বিরুদ্ধে ধর্মবিশ্বাসী মুসলমানদের প্রতিবাদী চেতনা জেগে ওঠে, কখনো কখনো তা উগ্রবাদে রূপ নেয়।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে মুসলিমরা যেভাবে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হচ্ছে, এটি যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে যতই শক্তি প্রয়োগ করা হোক না কেন উগ্রবাদের উত্থান বন্ধ করা যাবে না। সেটি বন্ধ করতে আঞ্চলিকভাবে রাষ্ট্রগুলোকে সমঝোতায় আসতে হবে এবং সম্মিলিতভাবে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে হবে।
এক নজরে উগ্রবাদ নির্মূলের উপায়-
১. জবরদখল ও সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন বন্ধ করা।
২. উগ্রবাদী মতবাদের বিরুদ্ধে সঠিক আদর্শ (Counter-ideology) তুলে ধরা।
৩. মুসলিম বিশ্বে আল্লাহ প্রদত্ত জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা।
৪. সমগ্র মুসলিম বিশ্ব রাজনৈতিক, ভৌগোলিক ও ধর্মীয় বিভাজন ভুলে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে সমঝোতায় আসা।
৫. বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে সংলাপ বৃদ্ধি করে সহমর্মিতা ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা।
অতএব আসুন, আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের সমাজ ও দেশকে শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িকতা, মব সন্ত্রাস, সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনসহ যাবতীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি রেনেসাঁ সৃষ্টি করি। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য ও ন্যায়পূর্ণ পৃথিবী গড়ে তুলি।
[লেখক: এমাম, হেযবুত তওহীদ; ফোন/হোয়াটসঅ্যাপ: ০১৬৭০১৭৪৬৪৩, ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৬১৭-৩২৯৩৯২]



















